ইতিহাস কখনো কেবল সাল-তারিখের সমষ্টি নয়। ইতিহাস মূলত মানুষের আবেগ, স্মৃতি ও সম্মিলিত সিদ্ধান্তের দীর্ঘ দলিল। রাষ্ট্রক্ষমতা আসে ও যায়, শাসনব্যবস্থা বদলায়, কিন্তু গণমানুষের নীরব উপস্থিতি ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষ্য হয়ে থাকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়া পরিবারকে ঘিরে তিনটি ঘটনা সেই নীরব অথচ উচ্চকণ্ঠ ইতিহাসের বিরল দৃষ্টান্ত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় Political Legitimacy beyond Power—ক্ষমতার বাইরে দাঁড়িয়ে যে বৈধতা অর্জিত হয়—জিয়া পরিবার সেই বাস্তবতার জীবন্ত উদাহরণ।
৩০ মে ১৯৮১ : রাষ্ট্রপতির মৃত্যু, কিন্তু রাষ্ট্রনৈতিক উত্তরাধিকারের সূচনাঃ
৩০ মে ১৯৮১—চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। এটি ছিল একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, তবে এর অভিঘাত ছিল রাষ্ট্রের কাঠামো জুড়ে। সামরিক ব্যারাক থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় উঠে আসা এই মানুষটি এক দশকের মধ্যেই হয়ে উঠেছিলেন জনভিত্তিক নেতৃত্বের প্রতীক। তাঁর জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি ছিল নিছক আনুষ্ঠানিক শোক নয়। এটি ছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে গণসমর্থনের সামাজিক বৈধতা (Social Mandate)–এর এক ঐতিহাসিক ঘোষণা। মানুষ সেদিন প্রমাণ করেছিল— নেতৃত্ব কেবল সাংবিধানিক পদ নয়, এটি বিশ্বাসের সম্পর্ক। জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন, “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” ধারণা উপস্থাপন করেন এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতির দর্শন দেন। তাঁর মৃত্যু একটি রাষ্ট্রকে শোকাহত করলেও তাঁর জানাজা একটি রাজনৈতিক দর্শনকে অমরত্ব দেয়।
রাজনৈতিক শূন্যতা ও এক নারীর অনিবার্য উত্থানঃ
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর রাজনীতিতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তা পূরণ হওয়া ছিল সময়ের প্রশ্ন। সেই শূন্যতা থেকেই ধীরে ধীরে আবির্ভাব ঘটে বেগম খালেদা জিয়ার। তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন প্রস্তুতি নিয়ে নয়, এসেছিলেন ইতিহাসের দায় নিয়ে। একজন গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছানো—এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ফল। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ—এই প্রতিটি ধাপ ছিল তাঁর রাজনৈতিক পরিণতির প্রমাণ। তিনি তিনবার প্রধানমন্ত্রী হন (১৯৯১, ২০০১, ২০০৬) এবং প্রতিবারই বিরোধী মতের অস্তিত্ব স্বীকার করে রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা করেন। এই কারণেই ইতিহাস তাঁকে আখ্যা দিয়েছে “আপোষহীন নেত্রী” হিসেবে।
আইন, রাজনীতি ও প্রতিহিংসার সীমারেখাঃ
২০০৮ সালের পর বাংলাদেশের রাজনীতি একটি ভিন্ন পর্বে প্রবেশ করে। বিরোধী রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে রাষ্ট্রযন্ত্রের আইনগত কাঠামো ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে বারবার। বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত একাধিক মামলা, ২০১৮ সালে কারাবরণ, গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি না পাওয়া—এসব ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির সঙ্গে ঘটে যাওয়া অবিচার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার সংকট। একজন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী যখন বন্দিত্বে জীবনযাপন করেন, তখন সেটি গণতন্ত্র বনাম কর্তৃত্ববাদের মৌলিক দ্বন্দ্বকে সামনে আনে।
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ : রাজনৈতিক নির্বাসনের অবসানঃ
১৭ বছর প্রবাসে কাটানোর পর ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায়। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না; এটি ছিল রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার পুনরুদ্ধার। জনসমাগম প্রমাণ করে দেয়—প্রবাস জনপ্রিয়তাকে ক্ষয় করে না, বরং কখনো কখনো তা আরও গভীর করে। এটি স্পষ্ট হয়ে যায়—জিয়া পরিবার কেবল ব্যক্তি নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ধারা ও উত্তরাধিকার।
৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ : বিদায়, কিন্তু ইতিহাসের সমাপ্তি নয়ঃ
৩০ ডিসেম্বর ২০২৫—বেগম খালেদা জিয়া ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁর জানাজায় মানুষের ঢল কোনো রাষ্ট্রীয় নির্দেশে আসেনি, কোনো প্রশাসনিক আয়োজন মানুষকে সেখানে টেনে আনেনি। এটি ছিল নিঃশব্দ ভালোবাসার প্রকাশ, বিশ্বাসের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা। সেই উপস্থিতি ইতিহাসকে নিঃশব্দে বলে দেয়—যিনি জীবদ্দশায় আপোষ করেননি, মৃত্যুতেও তিনি একা নন।
একদিন হাজারো মানুষের সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, “এই দেশ ছেড়ে, এই দেশের মানুষকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। এই দেশই আমার একমাত্র ঠিকানা।” সময়ের নিষ্ঠুরতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা ব্যক্তিগত যন্ত্রণা—কিছুই তাকে সেই প্রতিজ্ঞা থেকে সরাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত তিনি তার কথা রেখেছেন। জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন, কিছু মানুষ ক্ষমতার জন্য দেশকে ধারণ করেন না; বরং দেশই তাদের অস্তিত্বের শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে।
জনগণই শেষ আদালত রাষ্ট্রক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। আইন পরিবর্তনশীল। কিন্তু গণমানুষের স্মৃতি অমোচনীয়। সব নেতা এই সম্মান পান না। সব জানাজা ইতিহাস হয় না। সব প্রত্যাবর্তন জনসমুদ্র সৃষ্টি করে না। নিয়তি, ভাগ্য বা ঈশ্বরের আশীর্বাদ—যে নামই দেওয়া হোক—এই বিরল সম্মান কেবল তাদেরই ভাগ্যে জোটে, যারা জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত জনগণের পক্ষেই রায় দেয়।
কসমিক ডেস্ক