প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে সংঘাতের গল্প আমরা সাধারণত সিনেমা বা কল্পকাহিনীতে দেখি। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা সেই কল্পকাহিনীর বাস্তব প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা যত বাড়ছে, ততই নতুন এক আশঙ্কা সামনে আসছে—যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে পানি।
এই অঞ্চলের সংঘাত দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি সম্পদ, বিশেষ করে তেলকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। পশ্চিমা শক্তির দীর্ঘদিনের কৌশলগত আগ্রহও মূলত তেলের মজুদ ঘিরেই ছিল। তবে বর্তমান সংঘাত ধীরে ধীরে বিস্তৃত হওয়ার ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশও এতে জড়িয়ে পড়ছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ—পানি—এই সংঘাতের নতুন কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে বিশ্বের মোট মিষ্টি পানির মাত্র দুই শতাংশ পাওয়া যায়। ফলে এই অঞ্চলের দেশগুলোকে পানির জন্য ব্যাপকভাবে সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হয়।
ফ্রেঞ্চ ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, কুয়েতের প্রায় ৯০ শতাংশ পানির সরবরাহ আসে লবণমুক্তকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ওমানে এই হার প্রায় ৮৬ শতাংশ। সৌদি আরবে প্রায় ৭০ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ৪২ শতাংশ মিষ্টি পানি এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত হয়।
ওমানের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট, ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার সায়েন্সের গবেষক ড. উইল লা কেন জানান, ২০২১ সালে উপসাগরীয় অঞ্চলের লবণমুক্তকরণ কারখানাগুলো প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি কিউবিক মিটার পানি উৎপাদন করত। এই পরিমাণ পানি দিয়ে প্রায় আট হাজার অলিম্পিক মানের সুইমিং পুল ভরানো সম্ভব।
এ অঞ্চলের কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনও এখন অনেকাংশে এই পানির ওপর নির্ভরশীল। কারণ ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাওয়ায় সেচের জন্য আগের মতো সহজে পানি পাওয়া যায় না।
এই কারণেই পানি সরবরাহের অবকাঠামো এখন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান উভয় পক্ষই এই অবকাঠামোর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন এবং এটি সংঘাতের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
কাতারের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মার্ক ওয়েন জোনস বলেন, যদি উপসাগরীয় অঞ্চলের সরকারগুলো দেখতে পায় যে তাদের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর হামলা হচ্ছে, তাহলে তারা যুদ্ধ থামাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তার মতে, এ ধরনের হামলার উদ্দেশ্য সরাসরি সামরিক বিজয় নয়, বরং বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা।
সম্প্রতি বাহারাইন অভিযোগ করেছে যে তাদের একটি লবণমুক্তকরণ কারখানায় সরাসরি হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে ইরান দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র আগে হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপের একটি পানি কারখানায় হামলা করেছিল।
এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাত অঞ্চলে একটি পানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটেছে। কুয়েতের দোহা ওয়েস্ট পানিশোধন কারখানাও ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে জানা গেছে।
জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ওয়াটার, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হেলথের প্রধান অধ্যাপক কাভেহ মাদানি বলেন, এসব ঘটনা মূলত একটি বার্তা দেওয়ার কৌশল হিসেবেই দেখা যেতে পারে।
তার মতে, গুরুত্বপূর্ণ পানি অবকাঠামোর ওপর হামলার সম্ভাবনা তৈরি করে আতঙ্ক বজায় রাখা ইরানের একটি কৌশল হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে দীর্ঘমেয়াদে সবসময় এমন হামলা ঘটবে।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের পানি নিরাপত্তা যে কতটা নাজুক অবস্থায় রয়েছে, সেটিও এই পরিস্থিতির মাধ্যমে সামনে এসেছে।
ইরান নিজেও দীর্ঘদিন ধরে পানির তীব্র সংকটের মুখোমুখি। কম বৃষ্টিপাত, পুরনো পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে দেশের অনেক অঞ্চলে পানির ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
দেশটির বিভিন্ন নদী ও হ্রদের পানি কমে গেছে। বিশেষ করে জায়ানদেহ রুদ নদী এবং লেক উর্মিয়ার পানি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ভবিষ্যতের সংঘাত শুধু তেল বা গ্যাসের ওপর নির্ভর করবে না। নদী, ভূগর্ভস্থ পানির আধার এবং পানি লবণমুক্তকরণ কারখানাও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে।
এই বাস্তবতায় অনেকেই মনে করছেন, ভবিষ্যতের ভূরাজনৈতিক সংঘাতে পানি হয়তো তেলের মতোই গুরুত্বপূর্ণ—কিংবা কখনো কখনো তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কসমিক ডেস্ক