মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে লেবাননে যুদ্ধের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষের জীবনে। ইসরায়েলি হামলায় একসঙ্গে চার কন্যাকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন এক লেবানিজ বাবা। নিহত চার সন্তানের নাম জয়নব, জাহরা, মালেকা এবং ইয়াসমিন। সন্তানদের হারিয়ে ওই বাবা আর্তনাদ করে বলেছেন, “ওরাই ছিল আমার সব।”
শুধু সন্তানই নয়, এই হামলায় তিনি তার পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যকে হারিয়েছেন। যুদ্ধের এই ঘটনায় তার মা, বাবা, শ্যালক এবং এক ভাগ্নেও নিহত হয়েছেন। পরিবারে একের পর এক মৃত্যু তাকে গভীর শোকের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
লেবাননের একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যম আল জাদিদ টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মাহামুদ তকি বলেন, তিনি তার একমাত্র চার সন্তানকে হারিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি আমার চার সন্তান, চার মেয়েকে হারিয়েছি। ওরাই ছিল আমার একমাত্র সন্তান। আর আমার মা-বাবাকেও হারিয়েছি।” হামলার সময় তিনি নিজেও আহত হন। তার মুখ ও মাথায় আঘাত লাগে।
শুক্রবার নিহত পরিবারের সদস্যদের দাফন সম্পন্ন হয়। নিজের সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে বিদায় দিতে গিয়ে তিনি গভীর শোক প্রকাশ করেন। পরে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ইসরায়েল প্রায়ই দাবি করে যে তারা অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালায়। কিন্তু বাস্তবে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়িই ধ্বংস হচ্ছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি অবকাঠামো লক্ষ্য করাই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তার পরিবার কেন এই হামলার শিকার হলো।
দক্ষিণ লেবাননসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এমন ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে একের পর এক হামলায় বহু বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
শুক্রবারের আরেকটি ঘটনায় এক মা ইসরায়েলি হামলায় নিহত তার পাঁচ ছেলেকে দাফন করেছেন বলে জানা গেছে। একই সপ্তাহে বৈরুতের মধ্যাঞ্চলের ঘোবেইরি এলাকায় একটি বিমান হামলায় হামদান পরিবারের বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়।
ওই হামলায় পরিবারের কর্তা আহমেদ হামদান, তার তিন মেয়ে এবং দুই নাতি-নাতনি নিহত হন। হামলার পর কয়েকদিন ধরে ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ ছিলেন তার স্ত্রী।
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, লেবাননের পরিস্থিতি এখন গাজার সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। যুদ্ধের ফলে বহু পরিবার সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলমান সংঘাতের সময় ইতোমধ্যে দুই হাজার সাতশোর বেশি পরিবার সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এছাড়া প্রায় ছয় হাজার পরিবারের মধ্যে মাত্র একজন সদস্য জীবিত রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় হামলার ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইসরায়েলের আক্রমণ এবং বিভিন্ন এলাকা খালি করার নির্দেশের কারণে আট লাখের বেশি লেবানিজ নাগরিককে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়েছে।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) সম্প্রতি যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, লেবাননে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা অনেক ক্ষেত্রে গাজার পরিস্থিতির সঙ্গে মিল রয়েছে।
এমএসএফের লেবানন সমন্বয়কারী লু করম্যাক এক বিবৃতিতে বলেন, গত কয়েক বছরে গাজায় যা দেখা গেছে, লেবাননেও এখন একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। বারবার স্থানত্যাগের নির্দেশ, হাজার হাজার পরিবারের বাস্তুচ্যুতি এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বোমা হামলা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে চলা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি সহিংসতা থামাতে পারেনি। ফলে সাধারণ মানুষ এখন পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা বা বোমার মুখোমুখি হওয়ার মধ্যে আটকে পড়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা হিজবুল্লাহর রকেট হামলা এবং অন্যান্য সামরিক কার্যক্রম ঠেকাতেই লেবাননে অভিযান চালাচ্ছে।
তবে মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন পর্যবেক্ষক বলছেন, চলমান হামলার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
যুদ্ধের এই বাস্তবতায় লেবাননের বহু পরিবার তাদের প্রিয়জন হারিয়ে শোকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সন্তান হারানো সেই লেবানিজ বাবার আর্তনাদ যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়ের এক হৃদয়বিদারক প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
কসমিক ডেস্ক