ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড সফর শুধু একটি কূটনৈতিক সফর নয়, বরং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অবস্থানকে আরও সুসংহত করার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তিত আঞ্চলিক বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
বর্তমানে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মধ্যেও ভারত নিজেকে কেবল অংশগ্রহণকারী নয়, বরং আঞ্চলিক নীতিনির্ধারক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে।
মোদির সফরে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে সামুদ্রিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ নিয়ে আলোচনা হয়। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, খনিজ সম্পদ এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের বিষয় গুরুত্ব পায়। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে কৃষি, শিক্ষা, উদ্ভাবন ও বাণিজ্য সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব উদ্যোগ ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতিকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি একটি মুক্ত, উন্মুক্ত ও নিয়মভিত্তিক ইন্দো-প্যাসিফিক গঠনের লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে আসে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের উচিত এই পরিবর্তনকে কেবল ভারতকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে বৃহত্তর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। বিশেষ করে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখতে আঞ্চলিক উৎপাদন নেটওয়ার্ক, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং ভ্যালু চেইনে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও ব্লু ইকোনমি এখন বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বন্দর উন্নয়ন, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং সামুদ্রিক গবেষণায় আঞ্চলিক সহযোগিতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।
এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও ভারতের স্বার্থের মিল রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, উপকূলীয় ভাঙন এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো গঠনে দুই দেশের যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি বিনিময় ও সমন্বিত উদ্যোগ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি। ভারত, চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, আসিয়ানসহ সব গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য যেন নিষ্ক্রিয়তায় পরিণত না হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খল, প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সম্ভাবনা এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিকে কাজে লাগিয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আরও কার্যকর ও সক্রিয় অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ রয়েছে।
কসমিক ডেস্ক