একসময় বিকেলের সোনাঝরা রোদে মাঠজুড়ে দৌড়ঝাঁপ করা শিশু-কিশোরদের দৃশ্য ছিল গ্রামীণ ও শহুরে জীবনের অতি পরিচিত চিত্র। বন্ধুদের সঙ্গে খোলা মাঠে ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা নানা ধরনের খেলাধুলায় মেতে উঠত তারা। মাগরিবের আজান পর্যন্ত চলত সেই প্রাণবন্ত আনন্দ-উচ্ছ্বাস। ধুলোবালি মাখা শরীর, ঘামে ভেজা জামা আর ক্লান্ত মুখের হাসিতে ফুটে উঠত এক সুস্থ ও স্বাভাবিক শৈশবের প্রতিচ্ছবি।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আজকের শিশু-কিশোরদের একটি বড় অংশ মাঠের পরিবর্তে বন্দি হয়ে পড়েছে চার দেয়ালের ভেতর, যেখানে তাদের হাতে রয়েছে স্মার্টফোন আর চোখে স্ক্রিনের নীল আলো। বাস্তব খেলাধুলার জায়গা দখল করছে মোবাইল গেমস, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ভার্চুয়াল বিনোদন।
এই পরিবর্তন শুধু প্রযুক্তির অগ্রগতির ফল নয়; বরং এটি একটি গভীর সামাজিক ও মানসিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। যেখানে একসময় শিশুরা দলবদ্ধ খেলাধুলার মাধ্যমে নেতৃত্ব, সহযোগিতা, শৃঙ্খলা ও জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার শিক্ষা অর্জন করত, সেখানে এখন অনেকেই একাকী স্ক্রিনে ভার্চুয়াল জগতে সময় কাটাচ্ছে।
অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে খেলার মাঠের অভাব, অভিভাবকদের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং প্রযুক্তির আসক্তিমূলক নকশা—এই তিনটি বিষয় শিশুদের মাঠ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ফলে মোবাইল ফোন হয়ে উঠেছে তাদের প্রধান বিনোদনের মাধ্যম।
দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুদের মধ্যে স্থূলতা, চোখের সমস্যা, ঘাড় ও মেরুদণ্ডের ব্যথা, ঘুমের ব্যাঘাত এবং মানসিক অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের সামাজিক দক্ষতাও কমে যাচ্ছে। বাস্তব সম্পর্কের চেয়ে ভার্চুয়াল সম্পর্ক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদ্বেগজনক।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকেও মানুষের সময়কে উদ্দেশ্যহীনভাবে ব্যয় করা সমর্থনযোগ্য নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, মানুষকে অনর্থক সৃষ্টি করা হয়নি। (সুরা মুমিনুন: ১১৫) এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের একটি দায়িত্ব ও উদ্দেশ্য রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন প্রতিটি মানুষকে তার জীবন কীভাবে ব্যয় করেছে তা নিয়ে প্রশ্ন করা হবে। (তিরমিজি: ২৪১৭) তাই সময়ের যথাযথ ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে ইসলামে শারীরিক ও মানসিক শক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম। (সহিহ মুসলিম: ২৬৬৪) এখানে শক্তি বলতে শুধু শারীরিক শক্তি নয়, বরং দক্ষতা, কর্মক্ষমতা ও মানসিক দৃঢ়তাও বোঝানো হয়েছে, যা খেলাধুলা ও সুস্থ জীবনযাপনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে।
আজকের শিশু আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে—এটি একটি বাস্তব সত্য। তাই তাদের শৈশবকে স্ক্রিননির্ভর জীবন থেকে বের করে আনা অত্যন্ত জরুরি। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে শিশুদের জন্য খেলার মাঠ, নিরাপদ পরিবেশ এবং নৈতিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা যায়।
অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে, যেন প্রযুক্তি শিশুদের ধ্বংস না করে বরং উপকারে আসে। বই, খেলাধুলা, শারীরিক পরিশ্রম ও সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে শিশুদের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করা সম্ভব।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের ওপর। আজ যদি আমরা তাদের সঠিক পথে গড়ে তুলতে পারি, তবে আগামীকাল তারা হবে একটি শক্তিশালী, জ্ঞানী ও নৈতিক সমাজের ভিত্তি। আর যদি আমরা উদাসীন হই, তবে এর পরিণতি পুরো সমাজকেই বহন করতে হবে।
কসমিক ডেস্ক