সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা বাজারে ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত একটি হাসপাতাল দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। একসময় হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই হাসপাতাল এখন জরাজীর্ণ ও অবহেলিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
স্থানীয়দের দাবি, হাসপাতালটি পুনরায় চালু করা হলে সুরমা নদীর উত্তরপাড়ের তিন ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে এবং চিকিৎসা সেবা পাওয়া অনেক সহজ হবে।
স্থানীয় প্রবীণদের তথ্যমতে, ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটির নাম ছিল ‘সাচনা থানা ডিসপেনসারি’। ১৯৪০ সালে জামালগঞ্জ থানা প্রতিষ্ঠার আগেই এটি এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
তৎকালীন আসাম প্রাদেশিক সরকারের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই হাসপাতাল থেকে জামালগঞ্জ ছাড়াও তাহিরপুর, ধর্মপাশা ও বিশ্বম্ভরপুরসহ বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের মানুষ চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতেন।
পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে হাসপাতালের কার্যক্রম বর্তমান উপজেলা সদরে স্থানান্তর করা হয়। পরে ১৯৮২ সালে সেখানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠিত হলে পুরোনো হাসপাতালটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
বর্তমানে হাসপাতালের ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। একসময় অবৈধ দখলের শিকার হলেও পরবর্তীতে দখলমুক্ত করে সেখানে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। তবে হাসপাতাল চত্বরে বাজারের বর্জ্য ফেলার কারণে অনেক অংশ এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
হাসপাতালের পাশেই রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত শহীদ মিনার এবং বীর বিক্রম শহীদ সিরাজুল ইসলামের স্মৃতিফলক, যা এলাকাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।
হাসপাতালটি পুনরায় চালুর দাবিতে স্থানীয়রা বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। সাচনা বাজার বণিক কল্যাণ সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. খুরশিদ আলম গত বছর সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত আবেদন করেন।
তিনি বলেন, জামালগঞ্জ উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে তিনটি ইউনিয়ন সুরমা নদীর উত্তরপাড়ে অবস্থিত। এসব এলাকার মানুষকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে নদী পার হতে হয়।
বিশেষ করে রাতের বেলা জরুরি রোগী, প্রসূতি নারী কিংবা সংকটাপন্ন রোগীদের হাসপাতালে নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। অনেক সময় নদী পারাপারে বিলম্বের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের মতে, পুরোনো হাসপাতালটি পুনরায় চালু হলে উত্তরপাড়ের লক্ষাধিক মানুষ সহজে প্রাথমিক ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পাবেন। পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর চাপও কমে আসবে।
জামালগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম বলেন, ছোটবেলায় তিনি এই হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম দেখেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরেই হাসপাতালটি পুনরায় চালুর দাবি জানানো হচ্ছে।
এদিকে জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মঈন উদ্দিন আলমগীর জানিয়েছেন, হাসপাতালটি চালুর বিষয়ে একটি প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত মিনহাজুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী এই হাসপাতালটি পুনরায় চালুর দাবিতে স্থানীয়দের প্রত্যাশা এখন প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের দিকে।
কসমিক ডেস্ক