রাজধানীর আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বৈধ অগ্নি নিরাপত্তা লাইসেন্স না থাকা এবং বাধ্যতামূলক ফায়ার সেফটি প্ল্যান জমা না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার পর এই হাসপাতালের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের পর থেকে হাসপাতালটি তাদের অগ্নি নিরাপত্তা লাইসেন্স নবায়ন করেনি। একইসঙ্গে ফায়ার সেফটি প্ল্যান জমা দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ নিয়মও এখনো মানা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টাফ অফিসার শাহজাহান সিকদার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হলেও তারা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিন মাসের মধ্যে ফায়ার সেফটি প্ল্যান জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বলা হয়। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
নোটিশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, ‘ফায়ার প্রিভেনশন অ্যান্ড এক্সটিংগুইশিং অ্যাক্ট, ২০০৩’ এবং ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি)’ অনুযায়ী যেকোনো হাসপাতাল পরিচালনার আগে অগ্নি নিরাপত্তা পরিকল্পনার অনুমোদন ও বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, আদ-দ্বীন হাসপাতাল এসব আইন মেনে চলেনি।
অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের হিউম্যান রিসোর্স ও কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল দাবি করেছেন, হাসপাতালের সব নথিপত্র হালনাগাদ রয়েছে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। তার মতে, অগ্নি নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়েও তারা নিয়ম মেনেই কাজ করছে।
তবে এই দাবির বিপরীতে বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে সাম্প্রতিক ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালটির অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা ঘাটতি সামনে আসায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ ঘটনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। পাশাপাশি রমনা থানায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্তও চলমান রয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটনের চেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গত সপ্তাহে নবজাতকদের মৃত্যুর পর থেকেই হাসপাতালটিকে ঘিরে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহলে চিকিৎসা সেবার মান, ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি হাসপাতালের জন্য অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো দুর্ঘটনা এড়াতে ফায়ার সেফটি প্ল্যান, পর্যাপ্ত জরুরি নির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র এবং প্রশিক্ষিত কর্মী থাকা জরুরি। এসব নিয়ম উপেক্ষা করা হলে তা রোগী ও চিকিৎসাকর্মীদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর কথাও বলা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, আদ-দ্বীন হাসপাতালের এই ঘটনা দেশের স্বাস্থ্যখাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও তদারকির ঘাটতির বিষয়টি আবারও সামনে এনে দিয়েছে। এখন তদন্তের ফলাফলই নির্ধারণ করবে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে।
কসমিক ডেস্ক