জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচন আজ (২ জুন) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ সময় রাত ৮টায় এবং নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
প্রতিবছরের মতো এবারও আঞ্চলিক ঘূর্ণমান পদ্ধতির আওতায় সভাপতি নির্বাচিত হবে। এই নিয়ম অনুযায়ী এ বছর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে একজন প্রার্থী নির্বাচনের পালা এসেছে। সেই সুযোগে বাংলাদেশ তাদের প্রার্থী হিসেবে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে মনোনয়ন দিয়েছে।
এই নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছেন সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয় এস কাকোরিস। দুই অভিজ্ঞ কূটনীতিকের মধ্যে এই প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক গুরুত্ব পাচ্ছে। সদস্য দেশগুলোর ভোটেই নির্ধারিত হবে কে হবেন আগামী অধিবেশনের সভাপতি।
এর আগে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রথমে তৎকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনকে এই পদে মনোনয়ন দিয়েছিল। তবে একই সময় ফিলিস্তিন থেকেও একজন প্রার্থী থাকায় বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে প্রার্থিতা স্থগিত রাখে, যদিও তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়নি।
পরবর্তীতে ফিলিস্তিন তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিলে বাংলাদেশের প্রার্থিতা আবার সক্রিয় করা হয়। এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর নতুন সরকার খলিলুর রহমানকে এই পদের জন্য পুনরায় মনোনয়ন দেয়।
খলিলুর রহমান নির্বাচিত হলে এটি হবে বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন। প্রায় চার দশক পর দ্বিতীয়বারের মতো কোনো বাংলাদেশি প্রতিনিধি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাবেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে ৪১তম অধিবেশনে এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী।
গত ১৩ মে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় খলিলুর রহমান তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি জানান, নির্বাচিত হলে ‘পূর্ণকালীন সভাপতি’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং জাতিসংঘের সব সদস্য দেশের জন্য নিরপেক্ষভাবে কাজ করবেন। এ সময় তিনি ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন, যা সাধারণ পরিষদের কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও গতিশীল করার লক্ষ্য নিয়ে প্রণীত।
ওই সভায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠে—এই দায়িত্ব পালন করতে হলে তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হবে কি না। জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না। প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী তাকে এক বছরের জন্য দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে পারেন অথবা তিনি ছুটিতে থাকতে পারেন।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও স্পষ্ট করেছেন, একই সঙ্গে দুই দায়িত্ব পালনে কোনো আইনি বাধা নেই। তিনি জানান, নির্বাচিত হলে খলিলুর রহমান মন্ত্রী হিসেবে থাকবেন কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বাংলাদেশের বিজয়ের সম্ভাবনা নিয়ে সরকার আশাবাদী। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জাতিসংঘে খলিলুর রহমানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার গ্রহণযোগ্যতা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
সবশেষে বলা যায়, আজকের এই নির্বাচন শুধু একটি পদ নয়, বরং বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক মর্যাদার একটি বড় পরীক্ষা। ফলাফল যাই হোক, এই নির্বাচনের মাধ্যমে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সক্রিয় উপস্থিতি আবারও দৃশ্যমান হচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক