২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত একটি মৃদু ভূমিকম্পের পর চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক জিয়া স্মৃতি জাদুঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভূমিকম্পের ফলে শতবর্ষী এই ভবনের দেয়াল ও সিঁড়ির আশপাশে ফাটল দেখা দেয় এবং কয়েকটি স্থানে পলেস্তারা খসে পড়ে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তখনই জাদুঘরটি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো এটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হয়নি।
জাদুঘরটি বন্ধ থাকায় প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা নিয়ে কোনো স্পষ্ট সময়সূচি নেই। এতে পর্যটন ও সাংস্কৃতিক আগ্রহও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জাদুঘর সূত্রে জানা গেছে, ১১৩ বছরের পুরোনো এই ভবনে ২০০৬ সালের পর বড় ধরনের কোনো সংস্কার হয়নি। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বাজেট সংকটের কারণে ভবনটির রক্ষণাবেক্ষণও ঠিকভাবে করা সম্ভব হয়নি। ফলে ধীরে ধীরে এটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছায়। ভূমিকম্পের পর সেই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
সম্প্রতি ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে জাদুঘরের সীমানাপ্রাচীর, রেস্ট হাউস, আনসার ব্যারাক সংস্কার ও রং করার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি বাগান সৌন্দর্যবর্ধনের কাজও শেষ হয়েছে। মূল ভবনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে বুয়েটের পরামর্শ অনুযায়ী মেরামত কাজ করা হচ্ছে, তবে এখনো পুরো সংস্কার সম্পন্ন হয়নি।
চট্টগ্রাম নগরের কাজীর দেউড়িতে অবস্থিত এই ভবনটি ১৯১৩ সালে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত হয়। তখন এটি ‘লাট সাহেবের কুঠি’ নামে পরিচিত ছিল। পরে এটি সার্কিট হাউস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে এখানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। এরপর ১৯৯৩ সালে এটিকে জিয়া স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে উদ্বোধন করা হয়।
বর্তমানে এখানে ১৭টি গ্যালারিতে ৪২২টি নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। জিয়াউর রহমানের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত সামগ্রী, মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন উপকরণ এবং ঐতিহাসিক নথি এখানে প্রদর্শিত হয়। এছাড়া একটি গবেষণাগার, সেমিনার হল ও অডিটোরিয়ামও রয়েছে।
তবে জাদুঘর বন্ধ থাকলেও দর্শনার্থীদের আগমন থেমে নেই। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ জন মানুষ এসে ফিরে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত আনসার সদস্যরা। অনেকেই না জেনে এসে ফিরে যাচ্ছেন, আবার অনেকে দ্রুত সংস্কারের দাবি জানাচ্ছেন।
স্থানীয় দর্শনার্থীরা বলছেন, এটি শুধু একটি জাদুঘর নয় বরং দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই দ্রুত সংস্কার শেষ করে এটি খুলে দেওয়া উচিত। একই মত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোরও।
জাদুঘর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল ভবনটি পরিদর্শন করে বিস্তারিত প্রকৌশলগত মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা জানিয়েছে। বর্তমানে সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।
জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে জাদুঘরটি হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা, পূর্ণাঙ্গ সংস্কার প্রকল্প গ্রহণ এবং ধাপে ধাপে সীমিত পরিসরে কিছু গ্যালারি খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কবে পুরোপুরি চালু হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
সব মিলিয়ে ঐতিহাসিক জিয়া স্মৃতি জাদুঘর এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে, আর দর্শনার্থীদের অপেক্ষাও দীর্ঘ হচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক