যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নতুন কোনো ঘটনা নয়। কয়েক দশক ধরে চলা এই উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে সবচেয়ে জটিল ও আলোচিত দ্বন্দ্বগুলোর একটি। সময়ের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসন বদলেছে, কৌশল বদলেছে, কিন্তু ওয়াশিংটন ও তেহরানের পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং বৈরিতা এখনো একই জায়গায় রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতকে শুধুমাত্র ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা অন্য কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা যাবে না। কারণ, ইরানের রাজনৈতিক দর্শন ও আঞ্চলিক কৌশল বহু বছর ধরেই একই আদর্শিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ করে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে তেহরান নিজেদেরকে পশ্চিমা প্রভাববিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক ব্রেট এইচ. ম্যাকগার্ক মনে করেন, ইরানের বৈপ্লবিক আদর্শ এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের নীতি এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। তার মতে, কোনো রাষ্ট্র যখন দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক লক্ষ্যকে রাষ্ট্রনীতির অংশ বানায়, তখন শুধুমাত্র নিষেধাজ্ঞা বা কূটনৈতিক চাপ দিয়ে সেই অবস্থান বদলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রশাসন ক্ষমতায় এলেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়। ডেমোক্র্যাট প্রশাসন সাধারণত কূটনৈতিক সমাধান ও চুক্তিকে গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে রিপাবলিকান নেতৃত্ব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নেয়। তবে বাস্তবে কোনো কৌশলই ইরানের মূল রাজনৈতিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি।
ইরানের ইসলামি রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস বা Islamic Revolutionary Guard Corps শুধু একটি সামরিক বাহিনী নয়, বরং দেশটির বৈপ্লবিক আদর্শ বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রভাব মোকাবিলা করাকে তারা দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে।
বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের বড় হামলার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ইরানের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠী হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুথিদের সক্রিয় ভূমিকা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে বহুমাত্রিক রূপ দেয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে তেহরানের উত্তেজনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়।
Donald Trump তার প্রথম মেয়াদে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার মতো বড় সামরিক পদক্ষেপ এবং কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে তিনি তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। যদিও এসব পদক্ষেপ সাময়িক কৌশলগত সুবিধা এনে দিলেও ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব পুরোপুরি কমানো সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালি ও নতুন পরমাণু চুক্তি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা এবং যুদ্ধবিরতির গুঞ্জন শোনা গেলেও বাস্তবতা এখনো অনিশ্চিত। একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে ইরানের সামরিক প্রস্তুতি ও কঠোর বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যতদিন ইরানের রাজনৈতিক ও আদর্শিক কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন না আসবে, ততদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব পুরোপুরি শেষ হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। সাময়িক যুদ্ধবিরতি, নতুন চুক্তি কিংবা প্রশাসন পরিবর্তন হয়তো উত্তেজনা কমাতে পারে, কিন্তু মূল সংঘাতের শিকড় এখনো গভীরভাবেই রয়ে গেছে।
কসমিক ডেস্ক