ইরান বর্তমানে তার আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় পার করছে। ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট থেকে জন্ম নেওয়া জনবিক্ষোভ ধীরে ধীরে রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। সরকারি হিসাবেই স্বীকার করা হয়েছে, এই সহিংসতায় এখন পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১০ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে—ইরানের সরকার কি এই চাপ সামাল দিতে পারবে?
গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে দোকানিদের ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ইরানি রিয়ালের দরপতন, নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং বেকারত্ব মানুষের ক্ষোভকে বিস্ফোরণের দিকে ঠেলে দেয়। রাজধানী ছাড়াও ছোট শহর ও প্রান্তিক এলাকাগুলোতেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, যা ইসলামী বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে বিরল ঘটনা বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সরকার একদিকে আন্দোলনকারীদের ‘সন্তানসম’ বলে সংলাপের আশ্বাস দিলেও অন্যদিকে কঠোর দমননীতি চালাচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে হাসপাতালগুলো আহতদের চাপে ভরে গেছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি। ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, অনেক এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত অচল। এরই মধ্যে একজন বিক্ষোভকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার, যা আজ কার্যকর হওয়ার কথা।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিক্ষোভকারীদের প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং ‘সহায়তা আসছে’ বলে ইঙ্গিত দেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যকারী দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ ও প্রয়োজনে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকিও দিয়েছেন।
পশ্চিমা বিশ্ব থেকেও চাপ বাড়ছে। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্জ মন্তব্য করেছেন, সহিংসতার ওপর নির্ভর করে কোনো সরকার দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। তবে তেহরান এসব মন্তব্যকে বিদেশি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে এবং কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
ইরানের শাসকগোষ্ঠী অতীতেও বড় আন্দোলনের মুখে পড়েছে, কিন্তু এবার পরিস্থিতিকে ভিন্ন মনে করছেন বিশ্লেষকরা। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভালি নাসরের মতে, সংকট শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং কাঠামোগত ও অর্থনৈতিক। দমন করে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও মানুষের জীবনমানের অবনতি দীর্ঘমেয়াদে শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলবে।
তবে বাস্তবতা হলো, ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্র এখনো দৃঢ়। ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ঘিরে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও নিরাপত্তা কাঠামো এখনো ঐক্যবদ্ধ। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের পতনের কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই।
তবুও রাস্তায় নেমে আসা সাধারণ মানুষের ক্ষোভ চাপা পড়ছে না। তারা পরিবর্তন চায়—কীভাবে ও কত দ্রুত, তা নিয়ে মতভেদ থাকলেও দাবি একটাই। এই উত্তাল পরিস্থিতিতে সরকার সংলাপের পথে হাঁটে, নাকি আরও কঠোর দমননীতিতে যায়—সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ।
কসমিক ডেস্ক