বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার ধারা চলমান থাকলেও দেশের বাজারে তার প্রতিফলন সীমিত। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম এক পর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ ডলারের ওপরে থাকলেও কয়েক মাসের ব্যবধানে তা ৬৪ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে। অর্থাৎ প্রায় এক চতুর্থাংশ মূল্যহ্রাস ঘটে। কিন্তু একই সময়ে দেশে ডিজেলের দাম কমানো হয়েছে তুলনামূলকভাবে খুব সামান্য।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন লাভবান হয়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সংস্থাটি চার হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ভর্তুকি প্রত্যাহারের পর আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলা হলেও বাস্তবে মূল্য নির্ধারণে সেই সমন্বয় কতটা কার্যকর—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জ্বালানি তেল থেকে সরকারের রাজস্ব আয়ের পরিমাণও কম নয়। শুল্ক ও কর বাবদ হাজার হাজার কোটি টাকা আদায় হচ্ছে, যা সামগ্রিক রাজস্ব কাঠামোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্যক্ষ কর আদায়ে দুর্বলতা এবং বড় উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় মেটাতে গিয়ে জ্বালানি তেলকে কার্যত একটি রাজস্ব–নির্ভর পণ্যে রূপ দেওয়া হয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। পরিবহন খাতে জ্বালানি তেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হওয়ায় তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ভাড়া বাড়ে, যার প্রভাব পড়ে কৃষি উৎপাদন খরচ ও নিত্যপণ্যের দামে। ফলে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। যদিও বর্তমানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, তবুও তা এখনো ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে, যেখানে প্রতিবেশী অনেক দেশ তুলনামূলকভাবে কমিয়ে আনতে পেরেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, জ্বালানি তেলের দাম কমালে সীমান্ত এলাকায় পাচারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। পাশাপাশি বিপিসির মুনাফা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যেমন নতুন তেল শোধনাগার নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই লাভ ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
তবে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ও গবেষণা সংস্থাগুলোর বক্তব্য ভিন্ন। তাদের মতে, মূল্য নির্ধারণে যে সূত্র ব্যবহার করা হচ্ছে, তা পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়। অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা, অপচয় ও সম্ভাব্য অনিয়ম কমাতে পারলে জ্বালানি তেলের দাম আরও কমানো সম্ভব। আন্তর্জাতিক মানের নিরীক্ষা হলে প্রকৃত ব্যয় ও মুনাফার চিত্র স্পষ্ট হবে বলেও তারা মনে করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেল একটি কৌশলগত পণ্য। শুধু রাজস্ব বা মুনাফার দৃষ্টিকোণ থেকে এর দাম নির্ধারণ করলে ভোক্তা ও সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্ববাজারের সঙ্গে বাস্তবসম্মত ও স্বচ্ছ সমন্বয় ঘটানো গেলে পরিবহন ব্যয় কমবে, উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে এবং তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
কসমিক ডেস্ক