ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে আর বাকি মাত্র ৩৬ দিন। এই নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে চায় প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। তবে ভোটের পরিবেশ নির্বিঘ্ন রাখতে একাধিক চ্যালেঞ্জের কথা উঠে এসেছে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো কিছু আসনে নির্বাচন প্রতিহত করার চেষ্টা করতে পারে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো, প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে সহিংসতা এবং বড় দলগুলোর বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কাও রয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে অন্তত ৪০টি আসনে সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর মধ্যে সাতটি জেলা—গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গাজীপুর, নড়াইল ও বাগেরহাট—কে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এছাড়া আরও ১৫টি জেলাকে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রাখা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের অনেক জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতা আত্মগোপনে চলে গেছেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা গোপনে কর্মসূচির নামে বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা তৈরির চেষ্টা করছে।
সরকারি প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভোট গ্রহণের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে গুজব ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
সরকারের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে জানানো হয়েছে, সারা দেশে প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রের মধ্যে আড়াই হাজার কেন্দ্রকে অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্র পুরোপুরি সিসিটিভির আওতায় থাকবে। আরও প্রায় আট হাজার কেন্দ্রে ঝামেলার আশঙ্কা থাকায় সেখানে বাড়তি নজরদারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন উপলক্ষে ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাত লাখের বেশি সদস্য মাঠে থাকবে। এর মধ্যে আনসার-ভিডিপি, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রয়োজনে হেলিকপ্টার, ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের কথাও জানানো হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, নির্বাচন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, সে লক্ষ্যে সরকার অটল রয়েছে।
নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সরকার। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত তাদের দল। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব রোধে দলীয় মিডিয়া সেল সক্রিয় রয়েছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। এনসিপির নেতারা প্রশাসনের ভেতরে দলীয় পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে নির্বাচনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।
সব মিলিয়ে, আসন্ন সংসদ নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং গুজব নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সরকার। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত দায়িত্ব পালনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।