বাংলাদেশের পর্বতারোহণ জগতে এক অনন্য নাম ডা. বাবর আলী। এরই মধ্যে একাধিক দুর্গম শৃঙ্গ জয় করে তিনি নিজের সক্ষমতার স্বাক্ষর রেখেছেন। এবার তিনি নতুন এক চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন—বিশ্বের পঞ্চম সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট মাকালু জয়ের লক্ষ্যে।
রবিবার (৫ এপ্রিল) চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তার এই অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে জানানো হয়, আগামী ৭ এপ্রিল ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করবেন বাবর আলী। এরপর নেপালে পৌঁছে প্রয়োজনীয় অনুমতি ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করে তিনি কাঠমাণ্ডু থেকে টুমলিংটারের পথে রওনা হবেন।
সেখান থেকে শুরু হবে দীর্ঘ ট্র্যাকিং। প্রায় ১১ থেকে ১২ দিনের কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে তিনি পৌঁছাবেন মাকালুর বেস ক্যাম্পে, যার উচ্চতা প্রায় ৫৭০০ মিটার। এরপর শুরু হবে মূল আরোহন অভিযান। সবকিছু অনুকূলে থাকলে মে মাসের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সপ্তাহে তিনি চূড়ায় পৌঁছানোর আশা করছেন।
বিশ্বে ৮ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বত রয়েছে মোট ১৪টি। এই তালিকার চারটি শৃঙ্গ ইতোমধ্যে জয় করেছেন বাবর আলী, যা কোনো বাংলাদেশির জন্য এক অনন্য অর্জন। এবার তার লক্ষ্য মাকালু, যা তার পঞ্চম ৮ হাজার মিটার শ্রেণির অভিযান হতে যাচ্ছে।
মাকালু পর্বতটি ‘গ্রেট ব্ল্যাক ওয়ান’ নামেও পরিচিত। এর পিরামিড আকৃতির গঠন, খাড়া ঢাল এবং প্রচণ্ড বাতাস এটিকে অন্যতম চ্যালেঞ্জিং শৃঙ্গে পরিণত করেছে। আশপাশে বড় কোনো পর্বত না থাকায় এখানে বাতাসের তীব্রতা অনেক বেশি থাকে, যা আরোহীদের জন্য বড় বাধা।
সংবাদ সম্মেলনে বাবর আলী বলেন, ১৪টি আট হাজার মিটার শৃঙ্গ জয়ের স্বপ্ন তিনি অনেক দিন ধরেই লালন করছেন। ইতোমধ্যে সে লক্ষ্যে তিনি অনেকটাই এগিয়েছেন। মাকালু জয় সেই লক্ষ্য পূরণের পথে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
তিনি আরও জানান, মূলত তার পরিকল্পনা ছিল পাকিস্তানের কারাকোরাম অঞ্চলের নাঙ্গা পর্বত আরোহণ করা। তবে অর্থসংকট এবং সীমান্ত অঞ্চলের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে তিনি সেই পরিকল্পনা পরিবর্তন করে মাকালুকে বেছে নিয়েছেন।
অভিযানের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাকালুর বেস ক্যাম্পই অনেক উঁচুতে অবস্থিত। তাছাড়া এটি একটি বিচ্ছিন্ন পর্বত হওয়ায় প্রচণ্ড বাতাস এবং তুষারধসের ঝুঁকি সবসময় থাকে। এসব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেই তাকে এগোতে হবে।
পর্বতারোহণকে দেশের ক্রীড়াখাতে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিও জানান বাবর আলী। তার মতে, পর্বতারোহীরাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং প্রতিটি সফল অভিযানে দেশের পতাকা বিশ্বমঞ্চে উড়ানো হয়।
ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের প্রেসিডেন্ট ফরহান জামান জানান, মাকালু অর্থ ‘গ্রেট পিরামিড’। এর চূড়া পিরামিডের মতো এবং বাতাসের কারণে বরফ পড়ে কালচে রঙ ধারণ করেছে। ১৯৫৫ সালে প্রথম এই শৃঙ্গ জয় করেন লিওনেল টেরি ও ইয়ান কোজি। বাংলাদেশ থেকে ২০০৯ সালে একটি অভিযান পরিচালিত হলেও তা সফল হয়নি।
তিনি আরও বলেন, বাবর আলীর এই অভিযানে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হবে। পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে অনেক প্রতিভাবান পর্বতারোহী সুযোগ পাচ্ছেন না, তাই এ খাতে সরকারি সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালে বাবর আলী আমা দাবালাম জয় করেন, যা ছিল তার প্রথম বড় সাফল্য। এরপর ২০২৪ সালে তিনি বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট এবং চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট লোৎসে আরোহণ করেন। ২০২৫ সালে তিনি অন্নপূর্ণা-১ জয় করে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ইতিহাস গড়েন এবং একই বছর কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই মাউন্ট মানাসলু আরোহণ করেন।
সব মিলিয়ে, ডা. বাবর আলীর এই নতুন অভিযান শুধু ব্যক্তিগত অর্জনের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের পর্বতারোহণ ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনার সম্ভাবনাও তৈরি করছে। তার এই সাহসী উদ্যোগে দেশবাসীর প্রত্যাশা—বাংলাদেশের পতাকা আবারও উড়বে বিশ্বের অন্যতম কঠিন শৃঙ্গ মাকালুর চূড়ায়।