দেশের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন-এ নির্ধারিত সময়ের আগেই অবৈধভাবে মধু সংগ্রহের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। প্রতিবছর ১ এপ্রিল থেকে মধু সংগ্রহের মৌসুম শুরু হলেও তার আগেই কিছু অসাধু মৌয়াল অপরিপক্ব মৌচাক কেটে মধু সংগ্রহ করছে, যার ফলে পরিবেশ ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অপরিণত মৌচাক কেটে নেওয়ার কারণে মৌমাছির ডিম ও লার্ভা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে মৌমাছির স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ছে পুরো বনজ বাস্তুতন্ত্রে, কারণ মৌমাছি পরাগায়নের মাধ্যমে উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও বংশবিস্তার নিশ্চিত করে।
এই অবৈধ কার্যক্রমের কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। একই সঙ্গে যারা নিয়ম মেনে নির্ধারিত সময়ে মধু সংগ্রহ করেন, তারাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন। কারণ মৌসুমে গিয়ে তারা প্রত্যাশিত পরিমাণ মধু পাচ্ছেন না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সুন্দরবনের খলিশা ফুলের মধুর দেশব্যাপী ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বেশি দামে বিক্রির আশায় কিছু অসাধু ব্যক্তি মাছ ধরার অনুমতি ব্যবহার করে বনে প্রবেশ করে অপরিপক্ব চাক থেকে মধু সংগ্রহ করছে। পরে সেই মধু লোকালয়ে এনে চড়া দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুন্দরবন থেকে মধু সংগ্রহের ভিডিও প্রকাশ করে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রচার করা হচ্ছে। বিষয়টি বন বিভাগের নজরে এলেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর এলাকার গাবুরা গ্রামের মৌয়াল আব্দুর রহিম ও জামাল হোসেন জানান, অপরিপক্ব চাক থেকে মধু সংগ্রহ করলে মৌচাকের সংখ্যা দ্রুত কমে যায়। এতে প্রকৃত মৌয়ালরা তাদের আয় থেকে বঞ্চিত হন। তাদের দাবি, আগাম সংগ্রহ করা মধুর বড় অংশ গোপনে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হচ্ছে, বিশেষ করে বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের আওতাধীন এলাকায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মৌয়াল জানান, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে বন বিভাগের অনুমতি ছাড়াই মধু সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে। মাছ ধরার পাশ ব্যবহার করে বনে প্রবেশ করে মধু কেটে আনা হচ্ছে এবং বিনিময়ে কিছু অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আগাম সময়ে মধুর দাম বেশি পাওয়া যায়। পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি মধু ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এই অবৈধ কার্যক্রমকে আরও উৎসাহিত করছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুন্দরবনে মধু উৎপাদনে গত কয়েক বছরে ওঠানামা দেখা গেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে মধু সংগ্রহ হয়েছিল ৪ হাজার ৪৬৩ কুইন্টাল। পরের বছর তা কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮ কুইন্টালে এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে আরও কমে ২ হাজার ৮২৫ কুইন্টালে নেমে আসে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও আগাম মধু সংগ্রহের কারণে মোট উৎপাদন এখনও প্রভাবিত হচ্ছে।
বন বিভাগের হিসাবের বাইরে থাকা এই অবৈধ মধু সংগ্রহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। একই সঙ্গে মৌসুম শুরু হলে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মধু না পাওয়ার কারণে বন বিভাগের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মশিউর রহমান জানান, ১ এপ্রিল থেকে নিয়ম অনুযায়ী মধু সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হবে। তিনি বলেন, বন বিভাগ কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে এবং কেউ অবৈধভাবে মধু সংগ্রহ করলে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে, সুন্দরবনে টেকসই মধু আহরণ নিশ্চিত করতে হলে নির্ধারিত সময় মেনে চলা এবং মৌচাক সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনীতি—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
কসমিক ডেস্ক