আগামী সরকারের প্রথম ও সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে অর্থনৈতিক সংকট ব্যবস্থাপনা—এমন মতামত উঠে এসেছে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘পরবর্তী সরকারের জন্য সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এক সেমিনারে। সোমবার অনুষ্ঠিত এই সেমিনারের আয়োজন করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত করতে বাংলাদেশের শক্তিশালী ও কৌশলগত কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া এলডিসি উত্তরণ হলে রপ্তানি, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন অর্থায়নে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে। তাঁর মতে, আগামী সরকারের মেয়াদের শুরুতেই অর্থনৈতিক সংকট সামলানোর চাপে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ভিশন বাস্তবায়নের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে।
ড. রাজ্জাক বলেন, মুদ্রাস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং এলডিসি উত্তরণসংক্রান্ত তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জগুলো আগামী সরকারের পুরো মেয়াদকে প্রভাবিত করবে। এলডিসি উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, উন্নয়ন সহায়তার শর্ত আরও কঠোর হতে পারে এবং রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। এসব ঝুঁকি মোকাবেলায় অভ্যন্তরীণ নীতিগত সংস্কারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সক্রিয় ও ফলপ্রসূ কূটনৈতিক তৎপরতা জরুরি।
র্যাপিডের গবেষণায় সুশাসন ও আইন-শৃঙ্খলাকে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গবেষণায় বলা হয়, দেশে কাঠামোগত সমস্যা থাকলেও শাসনব্যবস্থা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সংস্কার বাস্তবায়নের দুর্বলতাই আগামী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ আকর্ষণে ধীরগতি, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে সীমাবদ্ধতা, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, তথ্য ও পরিসংখ্যানের নির্ভরযোগ্যতার ঘাটতি, শিল্প খাতের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরা হয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ট্যাক্স-টু-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে কমগুলোর একটি, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি। তিনি বলেন, রাজস্ব বাড়াতে হলে নগদ লেনদেন কমিয়ে ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে যেতে হবে। প্রয়োজনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকেও প্রণোদনা দিয়ে এই ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়বে এবং ধীরে ধীরে রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি আরও জানান, সরকার কাগজবিহীন কাস্টমস ব্যবস্থা চালু এবং বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় অটোমেশন কার্যক্রম জোরদার করছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও পোশাক খাত থেকে আর নতুন করে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ আসবে না। অটোমেশনের কারণে ইতোমধ্যে অনেক চাকরি কমে গেছে, অথচ শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি রয়েছে। তাঁর মতে, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও আইটি খাতে বড় সম্ভাবনা থাকলেও এর জন্য প্রয়োজন নীতিগত সহায়তা ও জ্বালানি নিরাপত্তা।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধূরী বলেন, দেশের জন্য নিরাপত্তা, সুশাসন ও মানসম্মত শিক্ষা আগামী সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এসব বিষয়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ঘাটতির কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ড. এম আবু ইউসুফ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ও ড. মোহাম্মদ মাইনুল ইসলাম আলোচনায় অংশ নেন।
কসমিক ডেস্ক