আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদ্য সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করায় বিচারিক কার্যক্রমে স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তন আসবে। তবে তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিগত সময়ে গুম, খুন ও জুলাই আন্দোলনে শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার যেন সঠিক বিচার ও ন্যায়বিচার পান।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে এসব কথা বলেন তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, “নতুন সরকার আসছে, এখন তাদের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে তাদের লোকজনকেই দায়িত্ব নেবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য যেন কোনোভাবেই হারিয়ে না যায়।”
তাজুল ইসলাম বলেন, বিগত বছরগুলোতে যারা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, বিশেষ করে যারা গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন এবং জুলাই আন্দোলনে যারা প্রাণ দিয়েছেন—তাদের স্বজনদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে রেখে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
নতুন চিফ প্রসিকিউটর সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, দায়িত্বে যিনি এসেছেন, তিনি অভিজ্ঞ একজন আইনজীবী। মামলার স্বার্থে কিংবা বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে যদি তার কাছ থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা চাওয়া হয়, তাহলে তিনি তা দিতে প্রস্তুত আছেন। “ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আমার অবস্থান স্পষ্ট,” বলেন তাজুল ইসলাম।
উল্লেখ্য, সোমবার সকালে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর পদ থেকে তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করে। তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আমিনুল ইসলাম-কে নতুন চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাজুল ইসলাম আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটরের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার দায়িত্বকালে জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুম ও খুনের অভিযোগগুলো তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব মামলার অগ্রগতি নিয়ে দেশ-বিদেশে আলোচনাও তৈরি হয়েছিল।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাইব্যুনালের নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও চলমান মামলাগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব মামলা শুধু আইনি বিষয় নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত। তাজুল ইসলামের বক্তব্য সেই ধারাবাহিকতার গুরুত্বই আবার সামনে এনেছে বলে তারা মনে করছেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, জুলাই আন্দোলনে শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার এখনো ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। একইভাবে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনরা দীর্ঘদিন ধরে বিচার দাবি করে আসছেন। এই প্রেক্ষাপটে সাবেক চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য নতুন সরকারের ওপর নৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে বলেও মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
তাজুল ইসলাম আরও বলেন, বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে মামলাগুলোর স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দ্রুত নিষ্পত্তি প্রয়োজন। রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতার পালাবদল যেন বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত না করে—এই প্রত্যাশার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “যারা শহীদ হয়েছেন বা গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, তাদের পরিবার শুধু প্রতিশ্রুতি নয়—বাস্তব বিচার চায়। সেই বিচার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।”
সব মিলিয়ে, চিফ প্রসিকিউটরের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেও বিচার প্রক্রিয়ার নৈতিক দায় থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করেন না তাজুল ইসলাম। তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও জুলাইয়ের শহীদ ও নিপীড়নের শিকার পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার পাওয়াই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।