যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তৎপরতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন তেল–গ্যাস–খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ–বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাবেক সদস্যসচিব এবং অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, একটি অনির্বাচিত সরকার কেন নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ও বিতর্কিত চুক্তিতে সই করতে এতটা ব্যস্ত ও অস্থির হয়ে পড়েছিল।
বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ওয়াচ’-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক আলোচনাসভায় তিনি এসব কথা বলেন। আলোচনাসভার মূল বিষয় ছিল ‘দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি’। সভায় বক্তারা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের করা চুক্তিগুলোর অর্থনৈতিক, আইনি ও নৈতিক দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
আনু মুহাম্মদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার চাইলে সহজেই যুক্তরাষ্ট্রকে জানাতে পারত যে, শিগগিরই নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে এবং এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নির্বাচিত সরকারের সঙ্গেই করা যেতে পারে। কিন্তু তা না করে তারা যেভাবে চুক্তিগুলো সম্পাদন করেছে, তাতে বাংলাদেশ কার্যত ‘হাত-পা বাঁধা’ অবস্থায় পড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
চুক্তি নিয়ে সরকারের তাড়াহুড়োর সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, বাজেট ঘোষণার সময় থেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে এসব চুক্তি করার এক ধরনের অতিমাত্রার উৎসাহ দেখা গেছে। এই উৎসাহ স্বাভাবিক নয় বলেই তার কাছে মনে হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান স্টারলিংকের সঙ্গে করা চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন করেন, এসব চুক্তির ফলে দেশের যোগাযোগব্যবস্থায় কী ধরনের বাস্তব পরিবর্তন এসেছে।
আনু মুহাম্মদের ভাষায়, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীরা যেভাবে এসব চুক্তি সম্পাদনে আগ্রহ দেখিয়েছেন, তাতে মনে হয়েছে তারা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোম্পানির লবিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। এই অবস্থান দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, এসব চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে বড় ধরনের সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য উন্মুক্ত ও খোলামেলা আলোচনা জরুরি। প্রয়োজনে এসব চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা উচিত বলেও তিনি মত দেন।
বিশেষভাবে বিএনপি সরকারের প্রতি ইঙ্গিত করে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ—তারেক রহমানের এই স্লোগান যদি সত্যি হয়, তাহলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত এই চুক্তিগুলো থেকে বাংলাদেশ কীভাবে মুক্তি পাবে, সেই পথ খুঁজে বের করা।’ একই সঙ্গে যারা এসব চুক্তি সম্পাদন করেছেন, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন হলে বিচারের আওতায় আনার কথাও বলেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তিকে ‘ভয়াবহ’ ও ‘বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে আনু মুহাম্মদ বলেন, নির্বাচনের কয়েক দিন আগে, ৯ ফেব্রুয়ারি চুক্তি স্বাক্ষরের কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছিল না। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ এখনো এমন চুক্তিতে সই করেনি। যেসব দেশ করেছে, তাদের চুক্তির শর্ত বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি সুবিধাজনক।
আলোচনাসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তিকে ‘অসম ও ক্ষতিকর’ বলে মন্তব্য করেন। তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পনীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বার্থকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তিনি বলেন, চুক্তিতে এমন বাধ্যতামূলক শর্ত রাখা হয়েছে, যা বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা দুর্বল করে দিয়েছে।
জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর আইনি ও নৈতিক বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলেন, এসব চুক্তির অনেক ধারা ‘আনফেয়ার কন্ট্রাক্ট টার্মস’ বা অসম চুক্তির উদাহরণ। তাই এগুলো নতুন করে বিচার-বিশ্লেষণ করা জরুরি।
নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন-এর সঞ্চালনায় আলোচনাসভায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ওয়াচের কো-অর্ডিনেটর বরকত উল্লাহ মারুফ। আলোচনায় উন্নয়ন অর্থনীতির গবেষক মাহা মির্জাও উপস্থিত ছিলেন।
সব মিলিয়ে আলোচনাসভায় বক্তারা একমত হন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের করা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিগুলো জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্মূল্যায়ন করা এখন সময়ের দাবি।