ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হবে—এমন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তিনি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমকে জানান, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সিরিয়ায় অবস্থানরত অবশিষ্ট মার্কিন সেনাদের ধাপে ধাপে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
ওই কর্মকর্তা বলেন, সিরিয়ার সরকার নিজেদের সীমান্তে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে সম্মত হয়েছে। ফলে সেখানে ব্যাপক মার্কিন সামরিক উপস্থিতির আর প্রয়োজন নেই বলে ওয়াশিংটনের ধারণা। নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক কৌশল বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইসলামিক স্টেট (আইএসআইএস)-এর উত্থান মোকাবিলায় ২০১৫ সাল থেকে মার্কিন সেনারা সিরিয়ায় অবস্থান করছে। ২০১৪ সালে আইএস দ্রুত শক্তিশালী হয়ে সিরিয়া ও ইরাকের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে তথাকথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। ওই সময় আন্তর্জাতিক জোট গঠনের মাধ্যমে আইএস দমনে সক্রিয় ভূমিকা নেয় যুক্তরাষ্ট্র।
তৎকালীন পরিস্থিতিতে প্রায় দুই হাজার মার্কিন সেনা সিরিয়ায় মোতায়েন করা হয়। বর্তমানে বিভিন্ন ঘাঁটিতে আনুমানিক এক হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছেন। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের সবাইকে পর্যায়ক্রমে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। ইতোমধ্যে একটি সেনাদল প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট একটি ঘাঁটি সিরিয়ার সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মার্কিন গণমাধ্যমকে বলেন, আইএস এখনো বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। গোষ্ঠীটিকে সম্পূর্ণ নির্মূল করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে আইএসের যে কোনো হুমকির জবাব দিতে মার্কিন বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। অর্থাৎ, প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিলেও সন্ত্রাসবিরোধী অঙ্গীকার থেকে সরে আসছে না ওয়াশিংটন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির কথা বলেছিলেন ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পদক্ষেপটি সামরিক উপস্থিতির পুনর্বিন্যাসের অংশ হতে পারে—যেখানে সরাসরি মাটিতে সেনা রাখার পরিবর্তে কৌশলগত ও সীমিত উপস্থিতির দিকে ঝুঁকছে যুক্তরাষ্ট্র।
সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ-এর আমলে। যুদ্ধের অস্থিরতার সুযোগে আইএস দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তবে গত কয়েক বছরে তাদের দখলকৃত অঞ্চল অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে এবং কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়েছে বলে দাবি করছে যুক্তরাষ্ট্র।
গত বছরের নভেম্বরে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন আল-শারা নামের এক সিরীয় নেতা। দেশটির ইতিহাসে কোনো সিরীয় নেতার এমন সফর এটিই প্রথম বলে উল্লেখ করা হয়। কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ বৃদ্ধির মধ্যেই সামরিক উপস্থিতি হ্রাসের সিদ্ধান্ত সামনে এলো।
বাশার আল আসাদের পতনের পর সিরিয়ার সরকারি বাহিনী মাঝে মাঝেই স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো হয়, যার আওতায় কুর্দি-নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেসকে (এসডিএফ) সিরিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে একীভূত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সমঝোতাও মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এখন কেবল সময়ের ব্যাপার বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মাত্রা, চূড়ান্ত বাস্তবায়নের গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কসমিক ডেস্ক