গ্রেপ্তারের একদিন পর চীনা মাছ ধরার নৌযানের ক্যাপ্টেনকে মুক্তি দিয়েছে জাপান। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। এ তথ্য প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা Agence France-Presse (এএফপি)।
জাপানের মৎস্য সংস্থার দাবি, সংশ্লিষ্ট ক্যাপ্টেন তাদের পরিদর্শন বা তল্লাশির নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানান। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই তাকে আটক করা হয়েছিল। তবে গ্রেপ্তারের মাত্র একদিন পরই তাকে মুক্তি দেওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
জাপান কর্তৃপক্ষ জানায়, গত বৃহস্পতিবার একটি চীনা মাছ ধরার নৌকা জাপানের মেশিমা দ্বীপ থেকে দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে প্রায় ৮৯.৪ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ১৬৬ কিলোমিটার) দূরে তাদের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবস্থান করছিল। জাপানের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো বিতর্কিত এলাকা নয় এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী তাদের এখতিয়ারভুক্ত অঞ্চল।
নৌকাটি আটক এবং ক্যাপ্টেনকে গ্রেপ্তারের পর চীন দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। বেইজিং নাবিকদের নিরাপত্তা ও আইনসম্মত অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়ে জাপানের প্রতি কূটনৈতিকভাবে বার্তা পাঠায়। বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
এদিকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সম্প্রতি চীনের প্রতি কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি সতর্ক করে বলেন, চীন যদি জোরপূর্বক কোনো স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ দখলের চেষ্টা করে, তবে জাপান সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করবে। তার এই মন্তব্য আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
প্রতিক্রিয়ায় বেইজিং টোকিওতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এবং চীনা নাগরিকদের জাপান সফরের ব্যাপারে সতর্কতা জারি করে। পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ বিমান মহড়া চালায়, যা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
চীন আরও ঘোষণা দিয়েছে, সম্ভাব্য সামরিক কাজে ব্যবহৃত হতে পারে—এমন কিছু পণ্যের জাপানে রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করা হবে। বিশেষ করে বিরল খনিজ পদার্থ (rare earth minerals) সরবরাহ সীমিত করা হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই খনিজগুলো আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সামুদ্রিক অঞ্চলে জাহাজ চলাচল, মাছ ধরার অধিকার ও একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের সীমা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই পূর্ব এশিয়ায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। যদিও জাপান জানিয়েছে, আটককৃত নৌকাটি কোনো বিতর্কিত এলাকায় ছিল না, তবুও ঘটনাটি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে স্পর্শ করেছে।
চীনা ক্যাপ্টেনের মুক্তি সাময়িকভাবে উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও সামরিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে, জাপান ও চীনের সম্পর্ক এখনো সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে এড়াতে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর সামুদ্রিক সংলাপ ও আস্থা-নির্মাণমূলক পদক্ষেপ জরুরি। নৌ-সীমা ও আইন প্রয়োগের প্রশ্নে স্বচ্ছতা বজায় রাখা না গেলে এ ধরনের পরিস্থিতি পুনরায় সৃষ্টি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, একদিনের ব্যবধানে চীনা ক্যাপ্টেনের মুক্তি তাৎক্ষণিক উত্তেজনা কিছুটা কমালেও, বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাপান-চীন সম্পর্ক এখনও সতর্ক নজরদারির মধ্যেই রয়েছে।