আগামী বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বহুল আকাঙ্ক্ষিত এই নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য প্রস্তুত দেশের মানুষ। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক এবং সচেতন মুসলিম হিসেবে ভোট দেওয়ার আগে ইসলামের দৃষ্টিতে ভোটের গুরুত্ব ও নৈতিক দায় সম্পর্কে জানা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আধুনিক গবেষক আলেমদের মতে, ইসলামে ভোট দেওয়া কেবল একটি নাগরিক অধিকার নয়; বরং এটি কোরআন-সুন্নাহর চারটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষার সমন্বিত দায়িত্ব পালন। এই চারটি দিক হলো—শাহাদাত বা সাক্ষ্য প্রদান, সুপারিশ, উকিল নিয়োগ এবং আমানত রক্ষা।
ভোট মানে সাক্ষ্য (শাহাদাত)
ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট দেওয়া মানে সাক্ষ্য প্রদান করা। অর্থাৎ একজন ভোটার যাকে ভোট দেন, তার ব্যাপারে সাক্ষ্য দেন যে ওই ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট পদের জন্য সর্বাধিক যোগ্য এবং তার চেয়ে যোগ্য আর কেউ নেই। কোরআনে ন্যায় ও ইনসাফের সঙ্গে সাক্ষ্য দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং মিথ্যা সাক্ষ্যকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আল্লাহ বলেন,
‘যখন তোমরা কোনো কথা বলো তখন ন্যায়নীতি অবলম্বন করো, সে ব্যক্তি তোমাদের নিকটাত্মীয় হলেও।’ (সুরা আনআম: ১৫২)
আরও বলা হয়েছে,
‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে... সুবিচার করো।’ (সুরা মায়িদা: ৮)
আলেমরা বলছেন, যোগ্যতম প্রার্থীকে বাদ দিয়ে আত্মীয়তা, দলীয় সম্পর্ক কিংবা বিরোধিতার কারণে কম যোগ্য কাউকে ভোট দিলে তা মিথ্যা সাক্ষ্যের আওতায় পড়ে। কোরআনে মিথ্যা সাক্ষ্যের বিষয়ে সতর্ক করে বলা হয়েছে,
‘মিথ্যা কথা বলা থেকে বিরত হও।’ (সুরা হজ: ৩০)
হাদিসে রাসুল (সা.) মিথ্যা সাক্ষ্যকে বড় গুনাহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বুখারির বর্ণনায় এসেছে, নবী (সা.) বারবার “মিথ্যা সাক্ষ্য” শব্দটি উচ্চারণ করে এর ভয়াবহতা তুলে ধরেন। একইভাবে অর্থের বিনিময়ে ভোট দেওয়া হলে সেখানে ঘুষ ও মিথ্যা সাক্ষ্য—দুটি বড় গুনাহ একত্র হয় বলেও উল্লেখ করা হয়।
ভোট মানে সুপারিশ
ভোটের দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হলো এটি সুপারিশ। একজন ভোটার যখন কাউকে ভোট দেন, তখন মূলত তিনি ওই প্রার্থীকে প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করার সুপারিশ করেন। ইসলামে সৎ কাজের পক্ষে সুপারিশ সওয়াবের কারণ, আর মন্দ কাজে সুপারিশ পাপের কারণ।
কোরআনে বলা হয়েছে,
‘যে লোক সৎ কাজের জন্য কোনো সুপারিশ করবে, তা থেকে সেও একটি অংশ পাবে।’ (সুরা নিসা: ৮৫)
আলেমদের মতে, যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দিলে তার ভালো কাজের সওয়াবের অংশও ভোটদাতা পেতে পারেন। পক্ষান্তরে অযোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনার ফলে তার অন্যায় ও দুর্নীতির দায়ও পরোক্ষভাবে ভোটদাতার ওপর বর্তাতে পারে।
ভোট মানে উকিল নিয়োগ
ভোটের তৃতীয় অবস্থান হলো উকিল বা প্রতিনিধি নিয়োগ। ভোট দিয়ে একজন ভোটার রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজের পক্ষ থেকে কাউকে প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করেন। তাই ইসলামে একজন আমানতদার, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে প্রতিনিধি বানানো জরুরি বলে মনে করেন আলেমরা। কারণ জাতীয় দায়িত্বে পুরো জনগণের অধিকার জড়িত থাকে। অযোগ্য ব্যক্তিকে প্রতিনিধি করা মানে জাতির হক নষ্ট করা এবং গুরুতর অন্যায়।
ভোট হলো আমানত
ভোটের চতুর্থ ব্যাখ্যা হলো—ভোট একটি আমানত। ইসলামী দৃষ্টিতে ভোটাধিকার আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের কাছে একটি আমানতস্বরূপ। এই আমানত সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। আমানতের খিয়ানত করা হারাম এবং ঈমানের পরিপন্থী কাজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাসুল (সা.) বলেছেন,
‘যার মধ্যে আমানতদারি নেই তার মধ্যে ঈমান নেই।’ (বাইহাকি)
আরেক হাদিসে বলা হয়েছে,
‘মুনাফেকের আলামত তিনটি... আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে।’ (বুখারি, মুসলিম)
আলেমদের মতে, উপযুক্ত ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া মানে আমানত সঠিক স্থানে পৌঁছে দেওয়া। আর যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে অযোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া মানে আমানতের খিয়ানত, যা ইসলামে স্পষ্ট হারাম।
সবশেষে আলেমরা বলছেন, ভোট দেওয়ার বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার নয়। বরং দায়িত্বশীলভাবে বিবেচনা করে যোগ্য, সৎ ও আমানতদার ব্যক্তিকে ভোট দেওয়াই ইসলামের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কসমিক ডেস্ক