কক্সবাজারের রামু উপজেলায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটি বিশাল অবিস্ফোরিত বোমা উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় চরম আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে যে ভারী ধাতব বস্তুটির ওপর দাঁড়িয়ে স্থানীয় নারীরা কাপড় ধুয়ে আসছিলেন, সেটিই যে একটি শক্তিশালী অবিস্ফোরিত বোমা—বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে বিস্ময় ছড়িয়ে পড়ে।
বোমাটি উদ্ধার করা হয় রামু উপজেলার কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের লট উখিয়ারঘোনা তছাখালী এলাকার একটি পুকুরপাড় থেকে। স্থানীয়দের ধারণা ছিল, এটি কোনো পুরোনো লোহার যন্ত্রাংশ। তবে সম্প্রতি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যামুনিশন বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে নিশ্চিত করেন, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটি শক্তিশালী অবিস্ফোরিত বোমা।
পুলিশ জানায়, প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর আগে পুকুর সংস্কারের সময় কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি বস্তুটিকে পানির নিচ থেকে তুলে পাড়ে রেখে দেন। এরপর দীর্ঘদিন সেটিকে ঘিরেই চলে দৈনন্দিন কাজকর্ম। বিশেষ করে নারীরা সেখানে নিয়মিত কাপড় ধুতেন। পরবর্তীতে পুকুরটি ভরাট হলে বোমাটি আব্দু শুক্কুর ড্রাইভার ও মনির আহমদের বাড়ির ভিটায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান জানান, সে সময় কেউই বুঝতে পারেননি এটি একটি বোমা। তিনি বলেন, সামনের দিকে পাখার মতো অংশ, একটি শিকল ও থালার মতো একটি লকার ছিল, যেগুলো ভেঙে ভাঙারির দোকানে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
আরেক বাসিন্দা সিরাজুল হক বলেন, এত বছর ধরে সেখানে মানুষের যাতায়াত, কাপড় ধোয়া ও দৈনন্দিন কাজ চললেও কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। তিনি এটিকে আল্লাহর রহমত বলে উল্লেখ করেন।
গত বৃহস্পতিবার রামুর ইতিহাস গবেষক ও আইনজীবী শিরূপন বড়ুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বোমাসদৃশ বস্তুটির ছবি প্রকাশ করেন। তিনি ধারণা দেন, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার জাপানি বোমা হতে পারে এবং এতে বিস্ফোরক রয়েছে কি না তা পরীক্ষা করা জরুরি। বিষয়টি দ্রুত পুলিশের নজরে আসে।
রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম ভুঁইয়া বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটি বড় অবিস্ফোরিত বোমা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বোমাটিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে চারপাশ ঘিরে ফেলা হয়েছে এবং সেনাবাহিনীকে জানানো হলে তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেয়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যামুনিশন বিশেষজ্ঞ ক্যাপ্টেন জান্নাতুল ফেরদৌসের নেতৃত্বে একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। সেনা সূত্র জানায়, বোমাটির ওজন আনুমানিক ৩০০ থেকে ৩২০ কেজি, দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৯ সেন্টিমিটার এবং ব্যাস প্রায় ১১৭ সেন্টিমিটার।
বর্তমানে বোমাটির চারপাশে নিরাপত্তা বেষ্টনী দেওয়া হয়েছে এবং এলাকাবাসীকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিষ্ক্রিয় না করা পর্যন্ত সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় থাকবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
এ বিষয়ে গবেষক শিরূপন বড়ুয়া বলেন, বোমাটি নিষ্ক্রিয় প্রমাণিত হলে এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। দশকের পর দশক অজান্তেই এমন ভয়ংকর অস্ত্রের পাশে বসবাসের বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।
কসমিক ডেস্ক