তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবন যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি অপরাধের ধরন ও বিস্তারও নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ডার্ক ওয়েব একটি আলোচিত নাম—যাকে ইন্টারনেটের ‘অন্ধকার জগৎ’ বলা হয়। এখানে ব্যবহারকারীরা পরিচয় গোপন রেখে এমন সব কার্যক্রম চালায়, যা সাধারণ ইন্টারনেটে প্রায় অসম্ভব।
ডার্ক ওয়েবে গড়ে উঠেছে এক ধরনের গোপন মার্কেটপ্লেস, যেখানে হ্যাকিং সেবা, মাদক, অস্ত্র, চোরাচালান, মানবপাচার, কপিরাইট লঙ্ঘন, পর্নোগ্রাফি এমনকি গুপ্তহত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধের লেনদেন হয়। প্রশ্ন হলো—ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের মার্কেটপ্লেস থেকে কেনাকাটা বা এতে যুক্ত থাকা কি কোনোভাবেই বৈধ হতে পারে?
১. হারাম পণ্যের ক্রয়–বিক্রয়
ডার্ক ওয়েব মূলত নিষিদ্ধ পণ্যের বাজার। মাদক, অস্ত্র ও অন্যান্য ক্ষতিকর দ্রব্য এখানে সহজলভ্য। অথচ কোরআনে স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে—
“হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি ও ভাগ্য নির্ধারণের তীর শয়তানের অপবিত্র কাজ—তোমরা তা বর্জন করো।”(সুরা মায়িদা: ৯০)
যে বাজারের মূল চালিকাশক্তিই হারাম পণ্য, সেখানে অংশগ্রহণ করা বৈধ হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
২. অশ্লীলতার প্রসার
ডার্ক ওয়েব পর্নোগ্রাফির অন্যতম বড় আশ্রয়স্থল। অনেক দেশে যেখানে এসব সাইট নিষিদ্ধ, সেখানে ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে মানুষ সহজেই এসব কনটেন্ট দেখে বা ক্রয় করে। ইসলামে শুধু অশ্লীলতায় লিপ্ত হওয়াই নয়, এর প্রচারও হারাম।
“যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে।”(সুরা নুর: ১৯)
৩. প্রতারণার উচ্চ ঝুঁকি
ডার্ক ওয়েবে ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয়ই পরিচয়হীন। ফলে প্রতারণা এখানে স্বাভাবিক ঘটনা। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন—
“যে আমাদের ধোঁকা দেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।”(সহিহ মুসলিম: ১৮৪)
প্রতারণাভিত্তিক লেনদেন ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
৪. অন্যের হক নষ্ট করা (কপিরাইট )
ডার্ক ওয়েবে পাইরেটেড সফটওয়্যার, বই, সিনেমা ও গান ব্যাপকভাবে কেনাবেচা হয়। অথচ এসব পণ্যের স্বত্ব নির্মাতার অধিকার। ইসলামে বান্দার হক নষ্ট করা বড় গুনাহ।
“তোমরা পরস্পরের মধ্যে অন্যায়ভাবে একে অন্যের সম্পদ গ্রাস কোরো না।”(সুরা নিসা: ২৯)
৫. চোরাই ও নকল পণ্য
অস্বাভাবিক কম দামে পাওয়া বহু পণ্য চোরাই বা নকল হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“যে ব্যক্তি জেনেশুনে চুরি করা বস্তু ক্রয় করল, সে চুরির অপরাধে অংশীদার হলো।”(মুসতাদরাকে হাকেম: ২২৮৭)
৬. চোরাচালান ও সামাজিক বিপর্যয়
ডার্ক ওয়েবের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো আইন ও রাষ্ট্রীয় নজর এড়িয়ে অবৈধ পণ্য হস্তগত করা। এটি ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবকিছুর জন্য ক্ষতিকর এবং পৃথিবীতে ফিতনা সৃষ্টি করে।
“পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি কোরো না।”(সুরা কাসাস: ৭৭)
উপসংহার
ডার্ক ওয়েব মার্কেটপ্লেস কোনো সাধারণ প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি মূলত হারাম, প্রতারণা, অশ্লীলতা ও অপরাধের সমন্বিত কেন্দ্র। ইসলামের দৃষ্টিতে এমন কোনো লেনদেন, যা হারাম পণ্য, অন্যের হক নষ্ট করা, প্রতারণা বা সামাজিক ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত—তা কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয়।
সুতরাং ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী ডার্ক ওয়েব মার্কেটপ্লেস ‘হালাল’ নয়; বরং এটি স্পষ্টভাবে হারাম ও পরিত্যাজ্য।