দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে বাড়ানো হবে এলএনজি আমদানি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন এবং জ্বালানি অবকাঠামোর উন্নয়ন। এ ক্ষেত্রে রুফটপ সোলারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
মঙ্গলবার রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে ‘জ্বালানি খাতের সংকট : সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব বিষয় উঠে আসে। ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি) আয়োজিত সেমিনারে জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জ্বালানিমন্ত্রী জানান, সরকার ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে রুফটপ সোলারে দ্রুত এগোচ্ছে। এ খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণে বিনিয়োগবান্ধব নীতির পাশাপাশি পাঁচ বছরের কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ক্লাস্টারভিত্তিক এবং অপেক্স মডেলে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হবে। তবে সরকার নিজে সরাসরি রুফটপ সোলারে বিনিয়োগ করবে না।
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি শিল্প খাতে গ্যাসের ঘাটতি নিয়েও সেমিনারে আলোচনা হয়। শিল্পের ক্ষতি কমাতে প্রধানমন্ত্রী, শিল্পোদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান মন্ত্রী। প্রয়োজন হলে শিল্পে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এলপিজি ব্যবহারের প্রস্তাব দ্রুত অনুমোদনের বিষয়েও ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানান তিনি।
দেশীয় গ্যাসের ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভোলার গ্যাস ব্যবহারে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান জ্বালানিমন্ত্রী। পাশাপাশি অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে যাওয়ার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জ্বালানি চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতির কথা স্বীকার করে জনগণের ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, দেশীয় কূপগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় গ্যাস সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে দ্রুত এলএনজি আমদানি বাড়ানোও সম্ভব হচ্ছে না। তবে নতুন এফএসআরইউ কার্যকর করা এবং মাতারবাড়ীতে ল্যান্ডবেসড এলএনজি টার্মিনালের কাজ এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও ডলার সংকটের সমাধান ছাড়া জ্বালানি সংকট মোকাবিলা কঠিন। তিনি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর পাশাপাশি ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের দিকে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
আলোচনায় বাপেক্সের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আন্তর্জাতিক কোম্পানির মাধ্যমে গ্যাস অনুসন্ধানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন বক্তারা।
এদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ঘাটতির প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। দ্রুত জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দেশীয় কয়লা ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে মাতারবাড়ীকে আঞ্চলিক এনার্জি হাব হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাবও এসেছে।
সব মিলিয়ে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার একদিকে আমদানি সক্ষমতা বাড়ানো ও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব দিচ্ছে, অন্যদিকে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটানোর পরিকল্পনা করছে। রুফটপ সোলারে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগও এই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কসমিক ডেস্ক