ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ঝাড়খণ্ড-এ কুসংস্কার ও গুজবের নির্মম পরিণতিতে এক নারী ও তার ১০ মাস বয়সী শিশুপুত্রকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। জাদুটোনা করার অভিযোগ তুলে উত্তেজিত লোকজন এই ভয়াবহ হামলা চালায়। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এ ঘটনায় পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
নিহত নারীর নাম জ্যোতি সিংকু। গত মঙ্গলবার রাতে তার বাড়িতে হামলা চালানো হয়। হামলার সময় তার স্বামী কোলহান সিংকুকেও মারধর করা হয়। তিনি গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন এবং বর্তমানে চিকিৎসাধীন। পুলিশ জানিয়েছে, এই হামলার সঙ্গে জড়িত অন্য সন্দেহভাজনদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, গ্রামে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও দীর্ঘদিনের কুসংস্কার এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ। সম্প্রতি গ্রামের এক ব্যক্তির অসুস্থতা ও মৃত্যুর জন্য জ্যোতি সিংকুকে দায়ী করা হয়। স্থানীয়ভাবে তাকে ‘জাদুটোনা করা নারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলে এক পর্যায়ে উত্তেজিত লোকজন সংঘবদ্ধ হয়ে তার বাড়িতে হামলা চালায়।
ঘটনাটি ঘটেছে ঝাড়খণ্ডের কুদসাই নামের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। গ্রামটি রাজ্যের রাজধানী রাঞ্চি থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। প্রত্যন্ত এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কুসংস্কার ও অজ্ঞতার কারণে এ ধরনের সহিংসতার ঝুঁকি রয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে।
ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (এনসিআরবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে দেশটিতে জাদুটোনার অভিযোগে আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। নিহতদের অধিকাংশই নারী। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, সামাজিক সচেতনতার অভাব এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগের কারণেই এমন সহিংসতা এখনও পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার চারজনের বিরুদ্ধে হত্যা ও ফৌজদারি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, মামলাটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ ঘটনার পর ঝাড়খণ্ড রাজ্য সরকার গ্রামাঞ্চলে কুসংস্কার ও গুজবের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্থানীয় জনগণের মধ্যে শিক্ষা ও সচেতনতা তৈরির জন্য বিশেষ কর্মসূচি চালু করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা আর না ঘটে।
এই হত্যাকাণ্ড আবারও ভারতে কুসংস্কারজনিত সহিংসতার ভয়াবহ দিকটি সামনে নিয়ে এসেছে। সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ নয়—শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারই পারে এই ধরনের অমানবিক অপরাধ ঠেকাতে।