নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার মগড়া নদীর ভয়াবহ ভাঙনে ঘরবাড়ি, আবাদি জমি ও বসতভিটা হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষ। প্রতিদিন নদীর গর্ভে বিলীন হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে শতাধিক পরিবারের উদ্বেগ ও আতঙ্ক।
বানিয়াজান ইউনিয়নের গাভুরকাছ গ্রামের বাসিন্দা সুফিয়া বেগমের জীবনের গল্প যেন নদীভাঙনের নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। কয়েক দশকের সংসার, জমিজমা ও বসতভিটা একে একে মগড়া নদীর গর্ভে হারিয়ে গেছে। এখন শেষ সম্বল হিসেবে রয়েছে একটি ছোট ঘর, সেটিও যে কোনো সময় নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুফিয়া বলেন, “সবকিছু গাঙে নিয়া গেছে। এই ঘরডাও যদি ভাইঙ্গা নেয়, তাইলে কোথায় যামু, কী করমু?” পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অস্থায়ীভাবে ওই ছোট ঘরেই কোনো রকমে দিন পার করছেন তিনি।
শুধু সুফিয়া বেগম নন, একই আতঙ্কে দিন কাটছে গাভুরকাছ, গোয়াতলা, কালিয়াখালী, বাখরপুর ও জয়নগর এলাকার অসংখ্য পরিবারের। স্থানীয়দের হিসাবে, বর্ষা শুরু হওয়ার পর থেকে এসব এলাকায় প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি পরিবার কমবেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। নদীর প্রবল স্রোতের কারণে অনেক জায়গায় মাটিতে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে এবং বহু বসতঘর ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদীর স্বাভাবিক স্রোতের পাশাপাশি ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙনের মাত্রা আরও বেড়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে বালু তোলার ফলে নদীর তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং দুর্বল হয়ে পড়ছে নদীর পাড়। ফলে সামান্য স্রোতেও বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিচ্ছে।
গাভুরকাছ গ্রামের বাসিন্দা ওমর হাসান রুপন জানান, মগড়া নদীর ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডে লিখিত আবেদন করা হলেও এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। অপরদিকে সাইফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িক প্রতিরোধের উদ্যোগও নেওয়া হয়নি।
নদীপাড়ের মানুষের দাবি, শুধু মৌসুমি বা সাময়িক ব্যবস্থা নয়, মগড়া নদীর ভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, বর্ষা মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো জরিপ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে নদীপাড়ের মানুষের প্রশ্ন একটাই—সেই ব্যবস্থা আসবে কবে? তার আগেই হয়তো আরও অনেক পরিবার হারাবে তাদের শেষ আশ্রয়টুকু।
কসমিক ডেস্ক