দেশের বাজারে যখন ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম দুই লাখ টাকার ঘর ছাড়িয়েছে, তখন বরিশালের সংসদীয় আসনের প্রার্থীদের হলফনামায় উঠে এসেছে একেবারেই ভিন্ন চিত্র। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে প্রার্থীরা সোনার যে মূল্য দেখিয়েছেন, তা বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বরিশালের ছয়টি সংসদীয় আসনের প্রার্থীরা তাঁদের হলফনামায় মোট ৮৩২ ভরি সোনা থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে ১৮ জন প্রার্থী জানিয়েছেন তাঁদের কাছে কোনো সোনা নেই। আবার ১৬ জন প্রার্থী সোনা থাকার কথা স্বীকার করলেও তার বাজারমূল্য উল্লেখ করেননি। বাকি প্রার্থীরা যে দাম উল্লেখ করেছেন, তা বর্তমান বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে কম।
বরিশাল-২ আসনে জাসদ মনোনীত প্রার্থী আবুল কালাম আযাদ তাঁর হলফনামায় ১৬ ভরি সোনা থাকার কথা জানিয়ে এর মোট মূল্য দেখিয়েছেন মাত্র ৩৬ হাজার টাকা। সে হিসাবে প্রতি ভরি সোনার দাম দাঁড়ায় ২ হাজার ২৫০ টাকা, যা বাজারদরের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
বরিশাল-৪ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী এসাহাক মো. আবুল খায়ের ৩০ ভরি সোনার দাম দেখিয়েছেন ৩ লাখ টাকা, অর্থাৎ ভরি প্রতি ১০ হাজার টাকা। বরিশাল-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী তহিদুল ইসলাম ১০ ভরি সোনার দাম উল্লেখ করেছেন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
অন্যদিকে বরিশাল-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার ৫০ ভরি সোনা থাকার কথা জানালেও এর কোনো মূল্য উল্লেখ করেননি। একইভাবে বরিশাল-৩ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া টিপু সর্বোচ্চ ২০০ ভরি সোনা থাকার কথা উল্লেখ করলেও অর্থমূল্য দেননি। বরিশাল-৫ ও ৬ আসনের প্রার্থী মুফতি সৈয়দ মো. ফয়জুল করিম ১৮৭ ভরি সোনার তথ্য দিলেও দাম উল্লেখ করেননি।
বরিশালের স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, এসব হিসাব অবাস্তব। স্থানীয় সোনা ব্যবসায়ী মান্না কর্মকার জানান, স্বাধীনতার আগেও ভরি প্রতি সোনার দাম ১৩৫ থেকে ১৫০ টাকা ছিল, আর বর্তমানে তা দুই লাখ টাকার ওপরে। বরিশাল জুয়েলারি মালিক সমিতির সভাপতি শেখ মো. মুসা বলেন, বর্তমানে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার টাকায় এবং ২১ ক্যারেটের দাম ২ লাখ ১২ হাজার টাকার বেশি।
হলফনামায় দেওয়া তথ্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিকরা। বরিশাল প্রেসক্লাবের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জাকির হোসেন বলেন, বাজারে সোনার দাম যেখানে দুই লাখ টাকার বেশি, সেখানে হলফনামায় দুই হাজার টাকা দেখানো নিঃসন্দেহে প্রতারণা। নির্বাচন সংস্কার না হওয়ায় এমন অসংগতি বারবার দেখা যাচ্ছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর বরিশাল মহানগর সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, হলফনামায় সোনা সংক্রান্ত তথ্যগুলো স্পষ্টতই সাংঘর্ষিক ও বিভ্রান্তিকর। এ ধরনের মিথ্যা তথ্য প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রয়োজনে মনোনয়ন বাতিল করা উচিত।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রার্থীদের সম্পদ বিবরণীতে এমন অসংগতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বাস্তব বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সম্পদের প্রকৃত মূল্য প্রকাশ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতেও হলফনামা নিয়ে বিতর্ক থামবে না।