বর্ষা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা দেখা দিলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—বন্যার পানি দিয়ে কি অজু বা ফরজ গোসল করা যাবে? ইসলামি শরিয়তের আলোকে এর উত্তর নির্ভর করে পানির প্রকৃতি ও পবিত্রতার ওপর।
ইসলামে পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা ইবাদতের অন্যতম শর্ত। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,
“আমি আকাশ থেকে পবিত্র ও পবিত্রকারী পানি বর্ষণ করেছি।”
(সুরা আল-ফুরকান: ৪৮)
বন্যার পানি কি পবিত্র?
ইসলামি ফিকহের মূলনীতি হলো, সব পানি মূলত পবিত্র এবং পবিত্রকারী। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো পানিকে অপবিত্র হওয়ার নিশ্চিত প্রমাণ না পাওয়া যায়, ততক্ষণ সেটিকে পবিত্র ধরা হবে।
বন্যার পানি সাধারণত বৃষ্টির পানি ও নদীর পানির সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়। এ দুই ধরনের পানিই শরিয়তের দৃষ্টিতে পবিত্র। তাই শুধুমাত্র বন্যার পানি হওয়ার কারণে সেটিকে অপবিত্র বলা যাবে না। (আল-হিদায়া, ফাতহুল কাদির: ১/৭৪)
ঘোলা পানি দিয়ে অজু করা যাবে?
বন্যার পানিতে মাটি, বালু বা কাদা মিশে ঘোলা হওয়া স্বাভাবিক। এসব পবিত্র বস্তু মিশে পানির রং পরিবর্তিত হলেও, যতক্ষণ পর্যন্ত সেটিকে সাধারণভাবে "পানি" বলা যায় এবং তার তরল বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন থাকে, ততক্ষণ সেই পানি দিয়ে অজু ও গোসল করা বৈধ।
ফিকহের কিতাবে উল্লেখ আছে, মাটি, বালু, সাবান বা জাফরানের মতো পবিত্র বস্তু মিশে পানির রং বদলে গেলেও তা অজুর উপযোগী থাকে। (শারহু মুখতাসার আত-তাহাবি ১/২২৭; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া ১/৭৩)
তবে কোনো পবিত্র বস্তু এত বেশি মিশে গেলে যে সেটিকে আর পানি বলা না যায়, তখন তা দিয়ে অজু বা গোসল করা বৈধ হবে না। (আল-হিদায়া, ফাতহুল কাদির: ১/৭৭)
নাপাকি মিশে গেলে কী হবে?
অনেক সময় বন্যার পানিতে নর্দমার পানি বা অন্যান্য নাপাক বস্তু মিশে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান হলো—
- যদি নাপাকির কারণে পানির রং, গন্ধ বা স্বাদের যেকোনো একটি পরিবর্তিত হয়ে যায়, তাহলে সেই পানি অপবিত্র হবে।
- কিন্তু নাপাকি মিশলেও যদি এই তিন বৈশিষ্ট্যের কোনো পরিবর্তন না ঘটে, তাহলে সেই পানি পবিত্র থাকবে এবং অজু ও গোসল করা বৈধ হবে। (ফাতাওয়া আলমগিরি: ১/৬৮)
একই বিধান প্রবাহমান নদী বা বড় জলাশয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
পানিতে প্রাণী মারা গেলে
যেসব প্রাণীর দেহে প্রবাহমান রক্ত নেই, যেমন—মাছি, মশা, ভোমরা বা বিচ্ছু—এসব প্রাণী পানিতে পড়ে মারা গেলে পানি অপবিত্র হয় না।
এছাড়া মাছ, কাঁকড়া বা ব্যাঙের মতো জলজ প্রাণী পানিতে মারা গেলেও সে কারণে পানি নাপাক হয় না। (শারহু মুখতাসার আত-তাহাবি: ১/২৭১)
পবিত্র পানি না থাকলে কী করবেন?
যদি বন্যার পানি অজু বা গোসলের উপযোগী না হয় এবং পবিত্র পানির কোনো ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে ইসলাম সহজ সমাধান দিয়েছে।
এ অবস্থায় তায়াম্মুম করা যাবে। মাটি, পাথর, দেয়াল বা এ জাতীয় বস্তু ব্যবহার করে তায়াম্মুম করে নামাজ আদায় করা বৈধ। (সুরা আন-নিসা: ৪৩; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া: ১/৮০)
সারসংক্ষেপ
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, বন্যার ঘোলা পানি মানেই অপবিত্র নয়। মাটি বা বালু মিশে পানি ঘোলা হলে এবং নাপাকির কারণে পানির রং, গন্ধ বা স্বাদ পরিবর্তিত না হলে সেই পানি দিয়ে অজু ও গোসল করা বৈধ। তবে পানির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়ে গেলে বা নাপাকির প্রভাবে এর মৌলিক গুণাবলি বদলে গেলে তা দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা যাবে না। এমন পরিস্থিতিতে তায়াম্মুমের বিধান প্রযোজ্য হবে।
কসমিক ডেস্ক