চাঁদ ঘুরে আসা ‘মুন ট্রি’: অ্যাপোলো ১৪ অভিযানের জীবন্ত স্মৃতি The Daily Cosmic Post
ঢাকা | বঙ্গাব্দ
ঢাকা |

চাঁদ ঘুরে আসা ‘মুন ট্রি’: অ্যাপোলো ১৪ অভিযানের জীবন্ত স্মৃতি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jul 11, 2026 ইং
চাঁদ ঘুরে আসা ‘মুন ট্রি’: অ্যাপোলো ১৪ অভিযানের জীবন্ত স্মৃতি ছবির ক্যাপশন:

১৯৭১ সালের ৩১ জানুয়ারি নাসার ঐতিহাসিক অ্যাপোলো ১৪ অভিযান চাঁদের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। এই অভিযানে ছিলেন তিন মহাকাশচারী—অ্যালান শেপার্ড, এডগার মিচেল এবং স্টুয়ার্ট রুসা। চাঁদে অবতরণের পর শেপার্ড ও মিচেল চাঁদের ফ্রা মাউরো এলাকায় বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান চালান। অন্যদিকে কমান্ড মডিউলে অবস্থান করে চাঁদের কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করেন স্টুয়ার্ট রুসা।

তবে এই অভিযানের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী অধ্যায় ছিল রুসার সঙ্গে বহন করা কয়েকশ গাছের বীজ। ব্যক্তিগত সামগ্রীর সঙ্গে রাখা এসব বীজ ছিল নাসা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বন বিভাগের একটি পরীক্ষামূলক গবেষণা প্রকল্পের অংশ। মহাকাশ ভ্রমণ শেষে পৃথিবীতে ফিরে সেই বীজ থেকে জন্ম নেয় বিখ্যাত ‘মুন ট্রি’ (Moon Tree)

কেন নেওয়া হয়েছিল গাছের বীজ?

স্টুয়ার্ট রুসা মহাকাশচারী হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের বন বিভাগে স্মোকজাম্পার হিসেবে কাজ করতেন। দাবানল নিয়ন্ত্রণে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে বন বিভাগ ও নাসার মধ্যে একটি গবেষণা পরিকল্পনা তৈরি হয়। উদ্দেশ্য ছিল—চাঁদের কক্ষপথে কয়েকদিন ভ্রমণের পর গাছের বীজের অঙ্কুরোদগম বা বৃদ্ধিতে কোনো পরিবর্তন ঘটে কি না, তা পরীক্ষা করা।

এই প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন বন বিভাগের উদ্ভিদ জিনতত্ত্ববিদ স্ট্যানলি এল. ক্রুগম্যান। পরীক্ষার জন্য লবললি পাইন, সিকামোর, সুইটগাম, রেডউড এবং ডগলাস ফারসহ বিভিন্ন গাছের বীজ নির্বাচন করা হয়।

চাঁদ প্রদক্ষিণের পর কী ঘটেছিল?

অ্যাপোলো ১৪ মিশনের সময় স্টুয়ার্ট রুসা কমান্ড মডিউল থেকে চাঁদের চারদিকে ৩৪ বার প্রদক্ষিণ করেন। তার সঙ্গে থাকা বীজগুলিও একই যাত্রা সম্পন্ন করে।

পৃথিবীতে ফেরার পর বীজগুলো লুনার রিসিভিং ল্যাবরেটরিতে জীবাণুমুক্ত করার সময় একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। বীজ রাখার পাত্র ভেঙে যাওয়ায় সব বীজ একসঙ্গে মিশে যায়। এতে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করেছিলেন, হয়তো এগুলো আর অঙ্কুরিত হবে না।

কিন্তু পরবর্তী পরীক্ষায় দেখা যায়, অধিকাংশ বীজ স্বাভাবিকভাবেই অঙ্কুরিত হয়েছে। পরে সেসব বীজ থেকে ৪০০টিরও বেশি চারা তৈরি করা সম্ভব হয়।

‘মুন ট্রি’ কেন বিশেষ?

গবেষণায় দেখা যায়, চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে আসা বীজ এবং পৃথিবীতে সংরক্ষিত একই ধরনের বীজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো জৈবিক পার্থক্য নেই। অর্থাৎ মহাকাশ ভ্রমণ গাছের বৃদ্ধি বা গঠন পরিবর্তন করেনি।

তবুও এই গাছগুলোর মূল্য বৈজ্ঞানিক ফলাফলের চেয়ে তাদের ইতিহাসে। কারণ পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম কোনো গাছের বীজ চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করে ফিরে এসেছিল।

১৯৭৫ ও ১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এসব গাছ দেশের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বিতরণ করা হয়। পরে স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি ভবন, নাসার বিভিন্ন গবেষণা কেন্দ্র ও পার্কে এগুলো রোপণ করা হয়।

সাধারণ গাছের মতোই দেখতে

বর্তমানে অনেক মুন ট্রি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে এখনো দাঁড়িয়ে আছে। তবে এগুলো দেখতে সাধারণ গাছের মতোই। পাশে বিশেষ ফলক না থাকলে কেউ বুঝতেই পারবেন না যে এই গাছের বীজ একসময় চাঁদের চারদিকে ঘুরে এসেছিল।

সময়ের সঙ্গে কিছু গাছ হারিয়ে গেলেও অনেক গাছ আজও মহাকাশ অভিযানের জীবন্ত স্মৃতি বহন করছে।

হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের পুনরাবিষ্কার

১৯৯৬ সালে ইন্ডিয়ানার এক শিক্ষিকা একটি মুন ট্রির ফলক দেখে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন। এরপর নাসার কর্মকর্তা ডেভিড আর. উইলিয়ামস বিভিন্ন নথি ও তথ্য সংগ্রহ করে মুন ট্রি প্রকল্পের ইতিহাস নতুন করে সামনে আনেন।

এর ফলে বহু বছর পর আবারও বিশ্বের মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে চলে আসে এই অনন্য প্রকল্প।

নতুন যুগে আবারও একই উদ্যোগ

অ্যাপোলো যুগের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালে নাসার আর্টেমিস-১ অভিযানে আবারও প্রায় দুই হাজার গাছের বীজ চাঁদের কক্ষপথে পাঠানো হয়।

নাসার লক্ষ্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মহাকাশ গবেষণা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক শিক্ষা সম্পর্কে আরও সচেতন করে তোলা। সেই দিক থেকে অ্যাপোলো ১৪-এর ‘মুন ট্রি’ শুধু একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নয়, বরং মহাকাশ গবেষণা, পরিবেশ এবং মানব ইতিহাসের এক অনন্য প্রতীক হয়ে রয়েছে।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : কসমিক ডেস্ক

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
শাজাহানপুরে চলন্ত বাসে আগুন, বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা

শাজাহানপুরে চলন্ত বাসে আগুন, বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা