বাংলাদেশের একমাত্র কুমারী বন হিসেবে পরিচিত বান্দরবানের সাঙ্গু ও মাতামুহুরী সংরক্ষিত বন বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এই বন এখন নানা মানবসৃষ্ট কারণে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বন রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, শতবর্ষী মাতৃগাছ নির্বিচারে কেটে জুম চাষের জন্য নতুন জমি তৈরি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে কাঠ সংগ্রহ ও পাচার অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে কাঠের চাহিদা বাড়ায় বন উজাড়ের প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে বনটির প্রাকৃতিক কাঠামো ও পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সাঙ্গু ও মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনকে দেশের একমাত্র কুমারী বন বলা হয়, কারণ এটি দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বনভূমির বৈশিষ্ট্য বহন করে আসছে। এ ধরনের বনে শতবর্ষী বৃক্ষ, বিরল উদ্ভিদ এবং নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল তৈরি হয়েছে। ফলে বনটির পরিবেশগত গুরুত্ব দেশের অন্যান্য বনাঞ্চলের তুলনায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন উজাড়ের মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। জুম চাষের জন্য পাহাড়ি ঢাল ও বনাঞ্চলের বড় বড় গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। এসব গাছের মধ্যে বহু পুরোনো মাতৃগাছও রয়েছে, যা প্রাকৃতিকভাবে নতুন বৃক্ষ জন্মানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব গাছ হারিয়ে যাওয়ায় বন পুনর্জন্মের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে অবৈধ কাঠ পাচারকারীরাও বনটির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। মূল্যবান কাঠ সংগ্রহ করে বিভিন্ন এলাকায় পাচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহারের কারণে বন থেকে কাঠ সংগ্রহের প্রবণতা আরও বেড়েছে।
বন রক্ষায় প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বন সংরক্ষণে নিয়মিত নজরদারি, অবৈধ গাছ কাটা বন্ধ এবং কাঠ পাচার প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে দুর্বলতার অভিযোগ রয়েছে। ফলে সংরক্ষিত বন হলেও বন উজাড় কার্যক্রম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি কুমারী বন শুধু গাছপালার সমষ্টি নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ, প্রাণী, পাখি, কীটপতঙ্গ এবং অণুজীবের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক সম্পর্ক বিদ্যমান। বন ধ্বংস হলে শুধু গাছ নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রই হুমকির মুখে পড়ে।
এ ধরনের বন জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, কার্বন শোষণ, পাহাড়ি ভূমি সংরক্ষণ, পানির উৎস রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সাঙ্গু ও মাতামুহুরী সংরক্ষিত বন ধ্বংস হলে এর প্রভাব শুধু স্থানীয় পরিবেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশের পরিবেশগত ভারসাম্যেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিবেশ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্টদের মতে, বন উজাড় বন্ধে কঠোর নজরদারি, অবৈধ কাঠ পাচার রোধ, জুম চাষের টেকসই বিকল্প ব্যবস্থা এবং বন ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আইন প্রয়োগ জোরদার এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের একমাত্র কুমারী বন হিসেবে পরিচিত সাঙ্গু ও মাতামুহুরী সংরক্ষিত বন দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বন রক্ষায় সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ হারানোর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
কসমিক ডেস্ক