রাষ্ট্র পরিচালনায় কাঠামোগত সংস্কার এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সংকট মোকাবিলায় আটটি খাতভিত্তিক বিশেষ সামাজিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এসব পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন, ক্রীড়া, পরিবেশ ও জলবায়ু সহনশীলতা এবং ধর্মীয় নেতাদের মর্যাদা ও কল্যাণ।
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘বিএনপি পলিসি ডিসসিমিনেশন অন প্রায়োরিটি সোশ্যাল পলিসিস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক কূটনীতিক ও উন্নয়ন অংশীদারদের সামনে এ পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের মোট ৩০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইরান ও বাহরাইনের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জিয়াউদ্দিন হায়দার। প্রবন্ধে বলা হয়, রাষ্ট্র মেরামতের লক্ষ্যে বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রণীত ‘দ্য প্ল্যান’-এর আওতায় সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এই আটটি সামাজিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। এটিকে প্রচলিত রাজনৈতিক চর্চা থেকে ভিন্নধর্মী উদ্যোগ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
খাতভিত্তিক পরিকল্পনায় ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি পরিবারকে মাসে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তা অথবা নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এই কার্ড পরিবারের একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নামে ইস্যু করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কৃষকদের জন্য প্রস্তাবিত কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সার, বীজ ও কীটনাশক ন্যায্যমূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। পাশাপাশি কৃষি প্রণোদনা, সহজ শর্তে ঋণ ও বিমাসুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। জলবায়ু ঝুঁকি, রোগবালাই ও বাজার অস্থিরতা মোকাবিলায় ফসল ও পশুপালন বিমাও এই কর্মসূচির অংশ হবে।
স্বাস্থ্য খাতে বিএনপি এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যাদের ৮০ শতাংশ নারী হবেন। তাঁরা ঘরে ঘরে গিয়ে সাধারণ রোগ শনাক্ত ও প্রাথমিক পরামর্শ দেবেন। গ্রাম ও শহর এলাকায় দোরগোড়ায় প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ২৪ ঘণ্টা বিনামূল্যে ওষুধ, বড় রোগে স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা, উপজেলা হাসপাতালে প্রসূতি সেবা সম্প্রসারণ এবং সারাবছর মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের কথাও উল্লেখ করা হয়।
শিক্ষা খাতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ পাঠ্যক্রম চালু এবং কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে ইন্টারনেট সুবিধা এবং বিদেশি ভাষা ও দক্ষতা উন্নয়নে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের কথা বলা হয়।
ক্রীড়া খাতে খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে গড়ে তোলা, চতুর্থ শ্রেণি থেকে বাধ্যতামূলক ক্রীড়া শিক্ষা, ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচির মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, ৬৪ জেলায় স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণসহ নানা পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন বা পুনঃখনন, তিস্তা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণ এবং সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দেশের বর্তমান চ্যালেঞ্জ বহুমাত্রিক। বিএনপির প্রণীত নীতিমালা ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে সক্ষম হবে। তিনি বলেন, এসব নীতি টেকসই উন্নয়নের পথ তৈরি করবে এবং নিম্ন আয়ের মানুষকে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি দেবে।
অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ূন কবির। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন, পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির বিশেষ সহকারী সাইমুম পারভেজ, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রাশেদুল হকসহ দলটির অন্যান্য নেতারা।
কসমিক ডেস্ক