ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। একই দিনে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে জনমত জানতে আয়োজন করা হয়েছে গণভোট। জাতীয় নির্বাচনের ডামাডোলে এই গণভোটের গুরুত্ব অনেকটাই আড়ালে পড়ে গেলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক চলছে।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) দেশের মূলধারার অধিকাংশ রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তারা নির্বাচনী প্রচারণার পাশাপাশি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সমাবেশ, পথসভা ও গণসংযোগের মাধ্যমে সংস্কারের পক্ষে জনমত গড়ে তুলছে। দলগুলোর বক্তব্য, কিছু আপত্তি বা নোট অব ডিসেন্ট থাকলেও রাষ্ট্রব্যবস্থার স্থায়ী সংস্কারের স্বার্থে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিকল্প নেই।
তবে জাতীয় নির্বাচনের প্রচার জোরালো হওয়ায় গণভোট নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা ও প্রচার হচ্ছে না—এমন উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অনেক রাজনীতিক ও বিশ্লেষক। তাদের মতে, যথাযথ প্রচার না হলে সাধারণ ভোটাররা গণভোটের তাৎপর্য বুঝতে ব্যর্থ হতে পারেন।
এর বিপরীতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও বর্তমানে নিষিদ্ধ কার্যক্রমের মুখে থাকা আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টিসহ একটি পক্ষ গণভোটে ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তারা প্রকাশ্যে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গণভোটের বিরোধিতা করে প্রচারণা চালাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারও সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। প্রায় ২০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী মাঠে ও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। বৃহস্পতিবার খুলনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় ইমাম সমাবেশেও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে বক্তব্য দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি গণভোট নয়; বরং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণের প্রশ্ন। দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে জুলাই জাতীয় সনদ ঘোষণা করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় বিভাজন তৈরি হলে দেশে নতুন রাজনৈতিক সংকট দেখা দিতে পারে বলে তারা সতর্ক করছেন।
গণভোটে যে বিষয়ে মতামত নেওয়া হচ্ছে, তা হলো—‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’। প্রস্তাবিত সংস্কারের মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক স্বাধীনতা জোরদার, বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত, প্রশাসনে দলীয়করণ কমানো এবং মৌলিক অধিকার ও ভোটাধিকার সুরক্ষা।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের গণভোটকে ‘সংবিধানবিরোধী ও অবাস্তব’ আখ্যা দিয়ে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ বেশিরভাগ দল বলছে, সংস্কার প্রশ্নে জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়া গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক মনে করেন, সরকার ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত প্রচারণা জরুরি। তিনি বলেন, সঠিক তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে, যা গণভোটের উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
সব মিলিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট এখন শুধু একটি সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
কসমিক ডেস্ক