৫৪ বছরের জমে থাকা সমস্যা বা ‘জঞ্জাল’ দেড় বছরের স্বল্পমেয়াদি সরকারের পক্ষে সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কার করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন; পানি সম্পদ এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, এই সীমিত সময়ের মধ্যে যতটুকু করা সম্ভব ছিল, সরকার তা করার চেষ্টা করেছে। তাই দায়িত্ব শেষে জবাবদিহিতা দিতে কিংবা প্রয়োজনে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে তার কোনো আপত্তি নেই।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত দু’দিনব্যাপী বাপা-বেন জাতীয় পরিবেশ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কাজ শুরু করার পর প্রথম চার মাসই কেটে গেছে প্রাথমিক প্রস্তুতি ও পরিস্থিতি সামাল দিতে। এরপর খুব দ্রুতই নির্বাচনকেন্দ্রিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ফলে বাস্তবে এই সরকার কার্যকরভাবে কাজ করার জন্য সর্বোচ্চ এক বছরের মতো সময় পেয়েছে। তাও আবার নানা প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়েছে।
তিনি জানান, সরকারের স্বল্প মেয়াদের কারণে নির্বাচন আয়োজনের জন্য অপরিহার্য বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করা হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে পরিবেশ ইস্যুকে উপেক্ষা করা হয়েছে। বরং সংস্কার কমিশনগুলোতে নাগরিক প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যা একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।
রিজওয়ানা হাসান বলেন, পরিবেশ ইস্যুতে নাগরিক প্রতিনিধিদের নিয়ে আলাদা কমিশন গঠনের সুযোগ ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। পরিবেশ কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
পরিবেশ সংস্কার নিয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন পৃথক পরিবেশ ক্যাডার চালুর সুপারিশ করেছে। একইভাবে সংবিধান সংস্কার কমিশন পরিবেশকে মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে। এসব সুপারিশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সরকারের স্বল্প মেয়াদে এগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তবে ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর জন্য এগুলো একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে।
উপদেষ্টা আরও বলেন, সরকার জবাবদিহিতাকে ভয় পায় না। বরং জনগণের কাছে জবাবদিহি করাকে দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেখে। তবে ৫৪ বছরের দীর্ঘ সময়ে তৈরি হওয়া সমস্যার দায় এককভাবে এই অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপানো বাস্তবসম্মত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তার ভাষ্যমতে, সীমিত সময়ের মধ্যেও সরকার পরিবেশ সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা সংস্কার, নদ-নদী ও জলাশয় সুরক্ষা, শব্দ ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব উদ্যোগের সুফল পেতে সময় লাগবে।
সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বেন)-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. নজরুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে একাধিক সংস্কার কমিশন গঠিত হলেও পরিবেশ বিষয়ে আলাদা কোনো কমিশন হয়নি, যা একটি বড় ঘাটতি। তিনি মনে করেন, পরিবেশ সংস্কারের বিষয়টি জুলাই সনদ ও রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, বাপা দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে পরিবেশ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। এ বছর পরিবেশ সংস্কারকে সামনে রেখে এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। সম্মেলন থেকে যেসব প্রস্তাব আসবে, তা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে তুলে ধরা হবে, যাতে তারা সেগুলোকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করে এবং ভবিষ্যতে বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেয়।
দু’দিনব্যাপী এই সম্মেলনে দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে ১১৭ জন বিশেষজ্ঞ পরিবেশ বিষয়ক প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন। সম্মেলনে প্রায় ৫ শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন। সম্মেলন শেষে একটি সমন্বিত সুপারিশমালা প্রকাশ করা হবে।