ওমর হালাওয়া—মাত্র ১৩ বছর বয়স। অথচ তার শৈশব থেমে গেছে অকালে। তিন মাস আগে উত্তর গাজার জাবালিয়ায় পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে ইসরাইলি গোলাবর্ষণে ডান পা হারায় সে। এখন সে আর দৌড়াতে পারে না, খেলতে পারে না—নিস্তব্ধ হয়ে গেছে তার জীবন।
ওমর একা নয়। গাজার হাজারো শিশু একই পরিণতির শিকার। কারো পা নেই, কারো হাত নেই, আবার অনেক শিশুর হাত-পা দুটোই নেই। প্রতিদিনের গোলাবর্ষণ কেড়ে নিচ্ছে তাদের শৈশব, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ। খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা—সবকিছু থেকেই বঞ্চিত তারা। শিশুদের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গায় পরিণত হয়েছে গাজা।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ২০ হাজারের বেশি শিশু নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার। দীর্ঘমেয়াদি অবরোধের কারণে খাদ্য ও ত্রাণ সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অপুষ্টি ও অনাহারে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ১৬৫ শিশু।
আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষণ সংস্থা আইপিসি সতর্ক করেছে, ২০২৬ সালেও গাজার ৭৭ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে থাকবে, যার মধ্যে প্রায় ৮ লাখ শিশু রয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থাও প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। গাজার শিক্ষা কর্তৃপক্ষ জানায়, যুদ্ধে ২০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে এবং প্রায় ৯০ শতাংশ স্কুল ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অবশিষ্ট স্কুলগুলো এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র। বাধ্য হয়ে তাঁবুর নিচে সীমিত পরিসরে পাঠদান চলছে।
মানসিক স্বাস্থ্যের দিক থেকেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা জানান, যুদ্ধের সহিংসতা, মৃত্যু প্রত্যক্ষ করা, বাস্তুচ্যুতি ও দীর্ঘ শিক্ষা-বিচ্ছিন্নতার কারণে শিশুরা গভীর মানসিক ট্রমায় ভুগছে। ইউনিসেফ সতর্ক করে বলেছে, দ্রুত মানবিক সহায়তা ও শিক্ষা পুনর্বহাল না করা হলে গাজা একটি “হারানো প্রজন্মের” মুখোমুখি হবে।
এ অবস্থার মধ্যেই নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। এমিরেটলিকস নামের একটি অনুসন্ধানী প্ল্যাটফর্মের হাতে আসা ফাঁস হওয়া নথিতে দাবি করা হয়েছে, গাজায় অভিযান ও গণহত্যা চালাতে ইসরাইলকে অস্ত্র, লজিস্টিক ও গোয়েন্দা সহায়তা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)।
ফাঁস হওয়া নথিটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইউএই সশস্ত্র বাহিনীর যৌথ অপারেশন কমান্ডের উদ্দেশে লেখা হয়েছিল। এতে উল্লেখ রয়েছে, ইয়েমেন, ইরিত্রিয়া ও সোমালিয়ায় অবস্থিত ইউএইর সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ইসরাইলকে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চলে এসব ঘাঁটি সামরিক ও লজিস্টিক কার্যক্রমে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই তথ্য প্রকাশের পর আরব বিশ্বের ভূমিকা এবং গাজা সংকটে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, শিশুদের ওপর এমন বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে যে কোনো ধরনের সামরিক সহায়তা মানবতাবিরোধী অপরাধকে আরও উৎসাহিত করে।
গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে আজ শুধু ঘরবাড়িই নয়, চাপা পড়ছে পুরো একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। ওমর হালাওয়ার মতো শিশুদের হারানো শৈশব এখন বিশ্ব বিবেকের কাছে এক নির্মম প্রশ্ন।