বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ২০ লাখ ইউরো সহায়তা দিয়েছে ফিনল্যান্ড সরকার। রবিবার (৩১ মে) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর। সংস্থাটি বলেছে, নতুন এই অর্থায়ন রোহিঙ্গাদের দক্ষতা বৃদ্ধি, টিকে থাকার সক্ষমতা উন্নয়ন এবং দীর্ঘদিন ধরে অর্থসংকটে থাকা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহায়তা প্রদান করতে ব্যবহৃত হবে।
প্রায় এক দশক আগে মিয়ানমারে লক্ষ্যভিত্তিক সহিংসতা ও নিপীড়নের মুখে দেশত্যাগে বাধ্য হওয়া বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করছে। ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। তাদের অধিকাংশই জীবিকা অর্জনের সীমিত সুযোগের কারণে মানবিক সহায়তা ও ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল।
সংস্থাটির তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে মাত্র ২৩ শতাংশ শরণার্থী পরিবার কাজের বিনিময়ে অর্থপ্রাপ্তি কর্মসূচির মাধ্যমে কিছু আয় করতে পেরেছে। এটি রোহিঙ্গাদের জন্য অনুমোদিত আনুষ্ঠানিক জীবিকাভিত্তিক কার্যক্রমগুলোর অন্যতম। অন্যদিকে ৪২ শতাংশ পরিবারের আয়ের উৎস ছিল অস্থায়ী ও অনিশ্চিত, আর ৩৫ শতাংশ পরিবারের কোনো ধরনের আয়ই ছিল না। ফলে এসব পরিবার পুরোপুরি মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
তহবিল সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে নারী, কিশোরী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠী। পাশাপাশি ২০২৪ সালের শুরু থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় দেড় লাখ নতুন রোহিঙ্গাও বিশেষ চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। ক্যাম্পগুলোতে জায়গার সংকট থাকায় তাদের অনেকেই এখনও পর্যাপ্ত আশ্রয়ের সুবিধা পাচ্ছেন না।
বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলার প্রচেষ্টা বর্তমানে একটি অত্যন্ত নাজুক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ক্রমহ্রাসমান তহবিল, ক্যাম্পগুলোর অবনতিশীল পরিস্থিতি, বাড়তে থাকা সুরক্ষা ঝুঁকি এবং মিয়ানমারের চলমান অস্থিতিশীলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তিনি ফিনল্যান্ডের এই সহায়তাকে দেশটির উদারতার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, মিয়ানমারের পরিস্থিতি এখনো স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের জন্য উপযুক্ত নয়। তাই রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ দায়িত্ব অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
নয়াদিল্লিতে ফিনল্যান্ড দূতাবাসের অন্তর্বর্তীকালীন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মারি আহমেদও রোহিঙ্গাদের প্রতি ফিনল্যান্ডের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বাস্তুচ্যুতির প্রায় এক দশক পরও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী তাদের জীবন পুনর্গঠনের সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। শুধু জরুরি সহায়তা নয়, তাদের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্যও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দক্ষতা উন্নয়ন, স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের একটি ভালো ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সহায়তা করা জরুরি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিসরে রোহিঙ্গা সংকট যাতে গুরুত্ব হারিয়ে না ফেলে, সে বিষয়েও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
ফিনল্যান্ডের এই অনুদান এমন সময়ে এসেছে, যখন জাতিসংঘ এবং এর মানবিক অংশীদাররা রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় নতুন করে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানাচ্ছে। গত ২০ মে রোহিঙ্গা মানবিক সংকটের জন্য যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার (জেআরপি) ২০২৬ সালের হালনাগাদ সংস্করণ উপস্থাপন করা হয়। এই পরিকল্পনার আওতায় শরণার্থী এবং স্থানীয় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীসহ মোট ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছাতে ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলারের তহবিল চাওয়া হয়েছে।
মানবিক সংস্থাগুলোর মতে, এই অর্থায়ন মূলত জীবনরক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তা পূরণে সহায়ক হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
কসমিক ডেস্ক