মায়ানমার সরকার গভীর সমুদ্র এলাকায় চারটি নতুন প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির তথ্য মন্ত্রণালয় (MOI) জানিয়েছে, এসব নতুন ক্ষেত্র মিলিয়ে আনুমানিক ১০৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (TCF) প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদের সম্ভাবনা রয়েছে, যা দেশটির জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নতুন আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মধ্যে আয়েয়ারওয়াদি এবং তানিনথারি অঞ্চলের গভীর সমুদ্র ব্লকও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় এখনো নির্দিষ্ট গ্যাসক্ষেত্রগুলোর নাম প্রকাশ করেনি। জানা গেছে, সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্রটি তানিনথারির গভীর সমুদ্র এলাকায় অবস্থিত, যেখানে প্রাথমিক মূল্যায়নে প্রায় ৯৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদের ৯০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে আয়েয়ারওয়াদি অঞ্চলের নতুন গ্যাসক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদের সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। এই দুটি প্রধান অঞ্চলের বাইরে আরও কিছু ব্লকে অনুসন্ধান কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তানিনথারি অঞ্চলের গভীর সমুদ্র ব্লক (বিশেষ করে এম-১৫ ব্লক) দীর্ঘদিন ধরেই সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গত বছরের ডিসেম্বরে বিবিসি নিউজ বার্মিজ জানিয়েছিল, এই ব্লকে প্রায় ৯৪.৬ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আবিষ্কৃত হতে পারে, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্যাস মজুদের মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এই ব্লকটি আন্দামান সাগরে তানিনথারি অঞ্চলের দক্ষিণ উপকূলের কাছাকাছি কাদান দ্বীপের পাশে অবস্থিত, যার আয়তন ১৩ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি। ২০১৫ সালে এই ব্লকের অনুসন্ধান ও উন্নয়ন নিলামে সিঙ্গাপুরভিত্তিক কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান CFG (Canadian Foresight Group) জয়ী হয় এবং পরে রাষ্ট্রায়ত্ত মায়ানমা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস এন্টারপ্রাইজের (MOGE) সঙ্গে উৎপাদন-বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করে।
প্রতিষ্ঠানটির ২০১৭ সালের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, এই প্রকল্প থেকে মায়ানমারের মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশের সমান রাজস্ব আসতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। সেই সময় ব্লকটির গ্যাসের সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ২৮০ বিলিয়ন ডলার হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়।
বর্তমানে মায়ানমারের জ্বালানি খাতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান MOGE অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে সামরিক সরকারের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক থাকার অভিযোগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২২ সালে এবং যুক্তরাষ্ট্র ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
এছাড়া থাইল্যান্ডভিত্তিক Gulf Petroleum Myanmar (GPM) ইতোমধ্যে কয়েকটি অফশোর প্রকল্পে অংশ নিয়েছে এবং নতুন গ্যাস প্রকল্পে বিনিয়োগ ও উৎপাদন পরিকল্পনা করছে। তবে মানবাধিকার সংস্থা জাস্টিস ফর মায়ানমার অভিযোগ করেছে, এসব প্রকল্পে পরোক্ষভাবে সামরিক সরকারের অর্থায়ন যুক্ত থাকতে পারে।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর নিরাপত্তা ও মানবাধিকার উদ্বেগের কারণে TotalEnergies, Chevron এবং Woodside-এর মতো বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানি মায়ানমার থেকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়।
সরকার দাবি করছে, নতুন গ্যাস প্রকল্পগুলো দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার শিল্প এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে MOGE দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করছে।
সব মিলিয়ে গভীর সমুদ্রে নতুন এই গ্যাস আবিষ্কার মায়ানমারের জ্বালানি খাতে বড় সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যদিও এর বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভবিষ্যতে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণ করবে।
কসমিক ডেস্ক