বাংলাদেশে চলতি বছরের মার্চ মাসে শুরু হওয়া হামের প্রাদুর্ভাব এখনো বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা ৮৫ হাজার ছাড়িয়েছে এবং শত শত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এখনো হাম আক্রান্ত শিশুদের চাপ অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, হামের সংক্রমণ দেশের অধিকাংশ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে। সংস্থাটি বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, প্রাদুর্ভাবের শুরুতেই আরও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে পরিস্থিতি এতটা দীর্ঘায়িত নাও হতে পারত। তাদের দাবি, জাতীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন ছিল।
অন্যদিকে সরকার বলছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুরু থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি চালু করেছে এবং নজরদারি কার্যক্রমও বাড়ানো হয়েছে। WHO জানিয়েছে, এপ্রিল মাস থেকে ধাপে ধাপে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে এবং আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করে বিশেষ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হলো টিকাদানের ঘাটতি। WHO-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ সময়ে এমআর (Measles-Rubella) টিকার সরবরাহ সংকট, নিয়মিত টিকাদানে বিঘ্ন এবং ২০২০ সালের পর বড় আকারের পরিপূরক টিকাদান কর্মসূচি না হওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিশু ঝুঁকিতে পড়ে। এর ফলে দেশে রোগপ্রতিরোধী সুরক্ষার বড় ফাঁক তৈরি হয়।
চিকিৎসকরা বলছেন, হামে আক্রান্ত অনেক শিশুর মধ্যে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ জটিলতা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল থেকে অনেক রোগী জটিল অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছানোয় মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। রাজধানীর শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগীর চাপও বেড়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনা, দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং জেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সুবিধা শক্তিশালী করা। একই সঙ্গে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার না করলে সংক্রমণ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ অতীতে হাম নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল। তবে সাম্প্রতিক এই প্রাদুর্ভাব দেখিয়ে দিয়েছে যে টিকাদান ব্যবস্থায় সামান্য ঘাটতিও বড় ধরনের স্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। এখন পরিস্থিতি কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, সেটিই স্বাস্থ্য খাতের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কসমিক ডেস্ক