সরকার এমপিদের নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রমে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগের মতো সরাসরি থোক বরাদ্দ দেওয়ার পদ্ধতি বাতিল করা হবে এবং এর পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়) অধীনে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।
নতুন ব্যবস্থায় সংসদ সদস্যরা (এমপি) তাদের এলাকার উন্নয়ন চাহিদা বা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে লিখিত প্রকল্প প্রস্তাব জমা দিতে পারবেন। তবে এসব প্রকল্পের অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের ওপর তাদের সরাসরি কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। সরকারের সার্বিক উন্নয়ন অগ্রাধিকার ও নীতিগত কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকলেই কেবল প্রকল্পগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে। সেলের নেতৃত্বে থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তার অনুপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব দায়িত্ব পালন করবেন। এ সেলের কাজ হবে এমপিদের প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এবং বাস্তবায়ন অগ্রগতি তদারকি করা।
আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এমপিরা স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বার্ষিক থোক বরাদ্দ পেতেন, যা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) মাধ্যমে বাস্তবায়ন হতো। তবে সেই ব্যবস্থায় দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে উঠছিল।
নতুন পরিকল্পনায় প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতি মাসে ৫ তারিখের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি রিপোর্ট দিতে হবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে। প্রয়োজনে কোনো জটিলতা দেখা দিলে তা সরাসরি নতুন সেলকে জানাতে হবে, যা সমাধানে ভূমিকা রাখবে।
এছাড়া এমপিদের প্রস্তাব যাচাইয়ের জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) তৈরি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রকল্প অনুমোদনের পর তা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অগ্রগতি জানাতে হবে।
এই উদ্যোগের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমপিদের সরাসরি অর্থ ব্যবহারের ক্ষমতা কমে গেলে দুর্নীতি ও অপচয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এই উদ্যোগ ইতিবাচক হতে পারে। তাঁর মতে, এতদিন এমপিদের সরাসরি তহবিল ব্যবহারের কারণে উন্নয়নের নামে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। নতুন কাঠামোয় প্রকল্প যাচাই-বাছাই ও মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে স্বচ্ছতা বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি ক্রয় আইন (PPA) এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। পাশাপাশি এমপিদের সরাসরি প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ততা কমিয়ে আনাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
সরকারি নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প নির্বাচন আরও কাঠামোবদ্ধ হবে এবং জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় বাড়বে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে প্রকৃত উন্নয়ন অগ্রাধিকার ভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
তবে এই নতুন ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সমন্বয়ের ওপর—এমন মত বিশ্লেষকদের।
কসমিক ডেস্ক