মার্কিন প্রশাসন কর্তৃক ইরানি তেলবাহী জাহাজ জব্দের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই ঘটনাকে ‘রাষ্ট্রীয় জলদস্যুতা ও সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে জাতিসংঘে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ইরান।
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি বুধবার নিরাপত্তা পরিষদের কাছে একটি চিঠি পাঠান। সেখানে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একই সঙ্গে তিনি জানান, ওয়াশিংটনের এই ‘বেআইনি’ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ইরান যেকোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রাখে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি ‘এমটি ম্যাজেস্টিক’ এবং ‘এমটি টিফানি’ নামে দুটি বাণিজ্যিক তেলবাহী জাহাজ থেকে প্রায় ৩৮ লাখ ব্যারেল তেল মার্কিন বাহিনী জোরপূর্বক জব্দ করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই মূলত কূটনৈতিক উত্তেজনা তীব্র হয়।
ইরানি রাষ্ট্রদূত দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নির প্রকাশ্য বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয় যে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় মাঝসমুদ্রে জাহাজগুলো আটক করা হয়েছে। তিনি একে জাতিসংঘ সনদের সরাসরি লঙ্ঘন এবং আগ্রাসনের শামিল বলে উল্লেখ করেন।
ইরান আরও অভিযোগ করে, বৈধ বাণিজ্যিক জাহাজে এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। একই সঙ্গে এটি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তেহরান এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আইনহীনতার নেশা’ বলে অভিহিত করেছে এবং এর সম্পূর্ণ দায় ওয়াশিংটনের ওপর চাপিয়েছে। ইরানের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌপরিবহন ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এই ঘটনা এমন সময়ে ঘটেছে যখন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগ্রাসন বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়। ইরান এই পদক্ষেপকে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি সাধারণ চলাচলের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এই প্রণালি বিশ্ব তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে বিবেচিত।
তেহরান আরও জানিয়েছে, অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনায় বসা সম্ভব নয়। এতে করে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চিঠির শেষাংশে ইরানি রাষ্ট্রদূত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে এই ঘটনার নিন্দা জানানোর আহ্বান জানান। পাশাপাশি তিনি জব্দকৃত জাহাজ ও তেলবাহী মালামাল অবিলম্বে এবং নিঃশর্তভাবে ফেরত দেওয়ার দাবি করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেই নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত সমুদ্রপথ নিয়ে উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে জাতিসংঘে ইরানের এই অভিযোগ দুই দেশের দীর্ঘদিনের উত্তেজনাকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় কূটনৈতিক সংঘাতের দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক