মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে সৌদি আরবের জেদ্দায় উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ইরানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতির পর এটি ছিল জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদের প্রথম মুখোমুখি বৈঠক। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে এই প্রথমবারের মতো এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির গুরুত্বকেই তুলে ধরে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল চলমান সংকট মোকাবেলায় একটি সমন্বিত অবস্থান তৈরি করা। উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান যুদ্ধের প্রভাব ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে অনুভূত হয়েছে, বিশেষ করে নিরাপত্তা ও জ্বালানি খাতে।
উল্লেখ্য, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত আকার ধারণ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি সৃষ্টি করে। এর ফলে পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং দেশগুলো উচ্চ সতর্কতায় চলে যায়।
সৌদি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বৈঠকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি পারস্পরিক সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষা, বেসামরিক স্থাপনা সুরক্ষা এবং সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
সংঘাতের প্রভাবে জিসিসির ছয়টি সদস্য দেশই জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতির মুখে পড়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-সংযুক্ত কোম্পানি, সামরিক ঘাঁটি এবং বেসামরিক স্থাপনাগুলোও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। হামলার তীব্রতা কিছুটা কমলেও নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা এখনও রয়ে গেছে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর রাজধানীগুলো এখনো উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।
স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলমান থাকলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ প্রেক্ষাপটে জিসিসির এই বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৈঠকে কাতারের আমির তামিম বিন হামাদ আল থানি, কুয়েতের আমির মিশাল আল আহমাদ আল সাবাহ, বাহরাইনের বাদশাহ হামাদ বিন ইসা আল খালিফা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অংশগ্রহণ করেন। তবে ওমানের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি, যদিও দেশটি জিসিসির সদস্য।
এদিকে বৈঠকের মধ্যেই জিসিসির ভূমিকা নিয়ে সমালোচনাও উঠে এসেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আনোয়ার গারগাস মন্তব্য করেছেন, লজিস্টিক সহায়তায় জিসিসি দেশগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখলেও রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে তাদের অবস্থান তুলনামূলক দুর্বল ছিল।
তিনি আরও বলেন, আরব লীগের কাছ থেকে এমন প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশিত হলেও জিসিসির ক্ষেত্রে এটি কিছুটা হতাশাজনক। তার এই মন্তব্য আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে, জেদ্দার এই বৈঠক উপসাগরীয় অঞ্চলের বর্তমান সংকট মোকাবেলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে এই বৈঠকের সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
কসমিক ডেস্ক