হাওরাঞ্চলের কৃষকের জীবনে এবার ঈদ আনন্দের বদলে এসেছে অনিশ্চয়তা ও হতাশা। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের কৃষক আবু বকর সিদ্দিক টানা বৃষ্টি, রোদ-বৃষ্টির খেলা এবং উজানের ঢলের কারণে তার ধান ঘরে তুলতে না পেরে চরম বিপাকে পড়েছেন।
তিনি জানান, এবারে প্রায় ৭০ কানি জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন, যার অর্ধেক নিজের জমি এবং বাকি বর্গা নেওয়া। বেশিরভাগ জমি ছিল নিকলী উপজেলার ডুবি হাওরে। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও পানির ঢলে অর্ধেকের বেশি ফসল তলিয়ে যায়। যে ধান কাটা সম্ভব হয়েছে, সেটিও সময়মতো শুকানো যাচ্ছে না। ফলে অনেক ধানে চারা গজাতে শুরু করেছে।
আবু বকর বলেন, “এক কানি জমিতে প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১১ লাখ টাকার মতো ব্যয় হয়েছে। ঋণ করেছি পাঁচ লাখের বেশি। এখন ধান বিক্রি না হলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে।”
তিনি আরও জানান, ঈদের সময় সন্তানকে নতুন পোশাক কিনে দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও ভেজা ধান বিক্রি করতে না পারায় সেই পরিকল্পনাও ভেস্তে গেছে। এবারের ঈদে কোরবানির পশু কেনা তো দূরের কথা, পরিবারের নিত্যপ্রয়োজন মেটানোই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু আবু বকর নন, একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন হাওরের অসংখ্য কৃষক। কেউ কেউ শ্রমিক দিয়ে ধান কেটে আনলেও বৃষ্টির কারণে খলায় বা রাস্তার পাশে শুকাতে পারছেন না। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কৃষকরা পরিবার নিয়ে ধান রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বৃষ্টি নামলেই দ্রুত পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে হচ্ছে ধান, আবার রোদ উঠলে ছড়িয়ে দিতে হচ্ছে।
নিকলীর কারপাশা ইউনিয়নের ভাটি নানশ্রী গ্রামের সত্তুরোর্ধ্ব কৃষক মনোয়ারা বেগমের অবস্থাও করুণ। স্বামীহারা এই নারী নিজের জমির ধান শুকাতে না পেরে এখন রাস্তায় বসে গজিয়ে ওঠা ধান রোদে শুকানোর চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, “আমার ঈদ নাই। ঈদের দিনেও রাস্তার পাশে ধান রাখতে হবে। ঘরে চাল নেই, কষ্ট করে দিন কাটছে।”
অন্যদিকে মজলিশপুর গ্রামের কৃষক হুমায়ুন মিয়া প্রায় ৩০০ মণ ধানের চাষ করেছিলেন। কিন্তু অর্ধেকের মতো ফসল তলিয়ে গেছে। তিনি জানান, এবারের লোকসানে কোরবানির পশু কেনার কোনো সুযোগ নেই, বরং ঋণের বোঝা আরও বেড়ে যাবে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, টানা বৃষ্টি ও ঢলের কারণে হাওরের প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। তবে স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকৃত ক্ষতি আরও বেশি।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, জেলায় মোট এক লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছিল। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলেই ছিল এক লাখ চার হাজার হেক্টর জমি। উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল প্রায় ১১ লাখ মেট্রিক টন ধান, কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ইতোমধ্যে ৫২ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের জন্য সরকারি সহায়তা হিসেবে নগদ অর্থ ও খাদ্য সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে হাওরের কৃষকরা এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখে। ঈদের আনন্দ নয়, তাদের ভাবনায় এখন একটাই প্রশ্ন—পরিবার কীভাবে চলবে, ঋণ কীভাবে শোধ হবে, আর পরের মৌসুমে তারা আবার চাষে ফিরতে পারবেন কি না।
কসমিক ডেস্ক