চীন সম্প্রতি রপ্তানি খাতে নতুন নীতি গ্রহণ করেছে, যা ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষী ১২০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স ও উৎপাদন খাতে ভারতের যে অগ্রগতি চলছিল, তা এই নতুন নীতির কারণে বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে ভারত নিজেকে চীনের বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে আসছে। বিশ্ববাজারে সরবরাহ শৃঙ্খলে বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেওয়ায় অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ভারতের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতে বড় বড় কোম্পানির সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে। পাশাপাশি দেশটিতে সেমিকন্ডাক্টর প্রকল্প এবং নতুন শিল্পপার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ভারতের ইলেকট্রনিক্স রপ্তানি ছিল মাত্র ৮.৬ বিলিয়ন ডলার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হয়ে ২০২৫ সালে ৪৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। দেশটির তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স মন্ত্রণালয় আশা করছে, ২০২৬ সালের মধ্যে এই রপ্তানি ১২০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে।
তবে এই আশাবাদী চিত্রের মধ্যেই চীনের নতুন নীতি উদ্বেগ তৈরি করেছে। বেইজিং সম্প্রতি একটি স্টেট কাউন্সিল ডিক্রির মাধ্যমে রপ্তানিতে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও উপাদান সরবরাহে নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ভারতের ইলেকট্রনিক্স ও অটোমোবাইল শিল্পে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থায় এখনও অনেকটাই চীনের ওপর নির্ভরশীল বিশ্ব। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি—সব ক্ষেত্রেই চীনা যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও ইলেকট্রনিক উপাদানের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে চীনের এই নতুন নিয়ন্ত্রণ ভারতের উৎপাদন সম্প্রসারণ পরিকল্পনাকে ধীর করে দিতে পারে।
শিল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চীনের এই পদক্ষেপের কারণে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তিগত উপাদান আমদানিতে বিলম্ব হতে পারে। এতে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নেও জটিলতা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে চীনা সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ভারতের নির্ভরতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
এ অবস্থায় ভারত সরকার বিকল্প পথ খোঁজার চেষ্টা করছে। দেশটির বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরবরাহ ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের ওপর নির্ভরতা কমাতে নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি আগামী তিন বছরে প্রায় ৩৩ হাজার ৬৬০ কোটি রুপি ব্যয়ে ৫০টি শিল্পপার্ক নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—যদি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে ভারত কতটা দ্রুত তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে? ইতোমধ্যে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান চীনা সরবরাহকারীদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে, যাতে নতুন নিয়মের প্রভাব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, চীনের নতুন রপ্তানি নীতি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর ফলে ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষী রপ্তানি লক্ষ্য অর্জনের পথ কিছুটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এখন দেখার বিষয়, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারত কতটা দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।
কসমিক ডেস্ক