যাযাবর জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম যেন বেদে সম্প্রদায়ের নিত্যসঙ্গী। নদীর ঘাট থেকে ঘাটে ঘুরে বেড়ানোই তাদের চিরচেনা জীবনধারা। তবে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার মীরগঞ্জ ফেরিঘাটসংলগ্ন আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে বসবাসকারী বেদে পরিবারগুলোর জীবনধারায় এসেছে কিছুটা পরিবর্তন। প্রায় এক দশক ধরে তারা এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, যা তাদের জন্য একটি ব্যতিক্রমী বাস্তবতা।
নদীতীর ঘেঁষে বাঁশ ও পলিথিন দিয়ে তৈরি ছোট ছোট ঘরেই গড়ে উঠেছে তাদের বসতি। সব মিলিয়ে প্রায় ৭০টি পরিবারের বাস সেখানে। স্থানীয়দের সঙ্গে সময়ের সঙ্গে গড়ে উঠেছে সখ্যতাও। তবে এই বসতিতে বড় একটি অভাব ছিল—শিক্ষার সুযোগ।
বেদে পরিবারগুলোর অধিকাংশ শিশুই কখনো বিদ্যালয়ের মুখ দেখেনি। দারিদ্র্য, অনিশ্চিত জীবন এবং শিক্ষার পরিবেশের অভাবে তারা ছোটবেলা থেকেই জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থেকে যায় একটি পুরো প্রজন্ম।
এই বাস্তবতায় পরিবর্তনের সূচনা করেছেন স্থানীয় দুই নারী—মোসাম্মৎ মুন্নি আক্তার ও মিতু আক্তার। তাদের উদ্যোগেই শুরু হয়েছে বেদে শিশুদের জন্য একটি ছোট্ট পাঠশালা। প্রতিদিন বিকেলে নদীতীরে খোলা আকাশের নিচে প্রায় ৫০ জন শিশুকে এক ঘণ্টা করে পাঠদান করেন তারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, একটি বাড়ির উঠানে বসেই চলছে এই পাঠদান কার্যক্রম। বই-খাতা বা পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ না থাকলেও শিশুদের চোখে-মুখে রয়েছে শেখার প্রবল আগ্রহ। তাদের এই আগ্রহই যেন শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
স্থানীয় বেদে পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় ১০ বছর আগে তারা এই এলাকায় নৌকা নিয়ে ভিড়েছিলেন। ধীরে ধীরে তারা তাদের ঐতিহ্যবাহী পেশা ছেড়ে মাছ ধরা ও অন্যের জমিতে কাজ করা শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয়দের সহানুভূতিও পেয়েছেন তারা। সেই ধারাবাহিকতায় শিশুদের শিক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
মুন্নি আক্তার বলেন, তারা চান বেদে শিশুরাও শিক্ষার আলোয় আলোকিত হোক। কিন্তু পর্যাপ্ত পরিবেশ, বই ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের অভাবে নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে যেতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রশাসন বা কোনো বেসরকারি সংস্থা সহযোগিতা করলে এই উদ্যোগ আরও বড় পরিসরে নেওয়া সম্ভব হবে।
বেদে নারী হেলেনা বিবি জানান, তাদের জীবনে সংগ্রামই বাস্তবতা। জীবিকা নির্বাহে শিশুদেরও ছোটবেলা থেকেই কাজে যুক্ত হতে হয়। তবুও শিশুদের পড়াশোনার আগ্রহ রয়েছে, কিন্তু উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তিনি মনে করেন, সরকার সুযোগ করে দিলে তাদের সন্তানরাও শিক্ষিত হতে পারবে।
স্থানীয়দের মতে, এই শিশুদের জন্য অন্তত একটি ছোট ঘর নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা হলে প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব। এতে করে এই উদ্যোগ আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারবে।
এ বিষয়ে বাবুগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা উল হুসনা বলেন, বেদে সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য উপজেলা প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে।
এছাড়া স্থানীয় পর্যায় থেকেও এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এমন ছোট ছোট উদ্যোগই সমাজে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সব মিলিয়ে, দুই নারীর এই উদ্যোগ বেদে শিশুদের জীবনে আশার আলো হয়ে উঠেছে। সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রচেষ্টা প্রমাণ করে, ইচ্ছাশক্তি থাকলে ছোট উদ্যোগ দিয়েও বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি করা সম্ভব।
কসমিক ডেস্ক