চীনের মগাসান অঞ্চলে অনুষ্ঠিত বিশ্বখ্যাত ইউটিএমবি সিরিজের ১০০ কিলোমিটার আল্ট্রা ট্রেইল প্রতিযোগিতায় অসাধারণ সাফল্য অর্জন করে নতুন ইতিহাস গড়েছেন বাংলাদেশের আল্ট্রা রানার ইমামুর রহমান। কঠিন আবহাওয়া, দুর্গম পাহাড়ি পথ এবং চরম শারীরিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও তিনি দৃঢ় মনোবল ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে ফিনিশ লাইনে পৌঁছান।
গত ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতায় শুরু থেকেই অংশগ্রহণকারীদের জন্য পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল। রেস শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরই প্রবল ঝড়-বৃষ্টি এবং তীব্র ঠান্ডা বাতাস শুরু হয়, যা ট্রেইলকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। পিচ্ছিল পথ এবং উচ্চতার কারণে অনেক প্রতিযোগী মাঝপথেই হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। কিন্তু ইমামুর রহমান দৃঢ় মানসিকতা নিয়ে নিজের গতি ধরে রেখে প্রতিযোগিতা চালিয়ে যান।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, যদিও এটি ১০০ কিলোমিটার ক্যাটাগরি হিসেবে পরিচিত, প্রকৃত ট্রেইলের দূরত্ব ছিল প্রায় ৮০ কিলোমিটার। তবে এর সঙ্গে যুক্ত ছিল প্রায় ৪,৬০০ মিটার এলিভেশন গেইন, যা এই প্রতিযোগিতাকে আরও কঠিন করে তোলে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫ হাজার প্রতিযোগীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ইমামুর রহমান ২০ ঘণ্টা ৩ মিনিটে রেস সম্পন্ন করেন, যা নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে তার কঠোর পরিশ্রম, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং মানসিক দৃঢ়তা। রেস শেষে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও মনোবল ধরে রাখাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ফিনিশ লাইনে বাংলাদেশের পতাকা উড়াতে পেরে তিনি গর্বিত।
রেসের পরিচালক জেনলি মা-ও তার পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, এমন কঠিন পরিস্থিতিতে টানা ১০০ কিলোমিটার ট্রেইল রেসে অংশ নেওয়াই অনেক বড় ব্যাপার, সেখানে সফলভাবে শেষ করা আরও বেশি কঠিন। ইমামুর রহমানের এই অর্জন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এটি একক কোনো সাফল্য নয়। গত ২৫ দিনের মধ্যে ইমামুর রহমান টানা তিনটি ট্রেইল রেস সম্পন্ন করেছেন। এর মধ্যে ১৫ মার্চ চীনের শিয়ামেনে ৯৭ কিলোমিটার এবং ২৯ মার্চ কংহুয়ায় ৩০ কিলোমিটারের একটি রেসও তিনি সফলভাবে শেষ করেন। এই ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তার ফিটনেস ও সহনশীলতার প্রমাণ দেয়।
এর আগে তিনি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে থাইল্যান্ডে ‘ইউটিএমবি এশিয়া মেজর’ সম্পন্ন করার গৌরব অর্জন করেন। এসব অর্জনের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক আল্ট্রা রানিং জগতে নিজের অবস্থান শক্ত করছেন।
পেশাগতভাবে একজন ব্যবসায়ী হলেও খেলাধুলার প্রতি তার নিবেদন তাকে আলাদা করে তুলেছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রশিক্ষণ নিয়ে এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়েও তিনি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশের প্রতিনিধিত্ব করে যাচ্ছেন।
বিশ্বব্যাপী আল্ট্রা ট্রেইল রেসিং একটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং খেলা হিসেবে পরিচিত, যেখানে শারীরিক শক্তির পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই জায়গায় ইমামুর রহমানের পারফরম্যান্স নতুন প্রজন্মের ক্রীড়াবিদদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।
তার এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্যও গর্বের। ভবিষ্যতে আরও বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
কসমিক ডেস্ক