পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। তবে দেশটি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, যেকোনো ধরনের সমঝোতা বা ছাড়ের বিনিময়ে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ আশা করছে তেহরান।
বার্তা সংস্থা আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ফোয়াদ ইজাদি জানান, ইরান আলোচনার টেবিলে বসতে প্রস্তুত, তবে তা একতরফা নয়। তার মতে, ইরান আগেও পারমাণবিক চুক্তিতে বড় ধরনের ছাড় দিয়েছিল এবং এখন সেই অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন শর্ত সামনে আনছে দেশটি।
তিনি বলেন, ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির সময় ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এই মাত্রার ইউরেনিয়াম দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পারমাণু সংস্থা (IAEA)-এর বিস্তৃত পরিদর্শন ব্যবস্থাও মেনে নিয়েছিল ইরান। ফলে তখনকার চুক্তিতে দেশটি উল্লেখযোগ্য ছাড় দিয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
ইজাদি বলেন, পারমাণবিক ইস্যু মূলত আলোচনার জন্য উন্মুক্ত একটি বিষয় এবং ইরান আবারও সমঝোতার পথে যেতে আগ্রহী। তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে স্পষ্ট বার্তা দেন যে, শুধু ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে তার জন্য আগেই একটি কাঠামো তৈরি রয়েছে।
তার ভাষায়, “পারমাণবিক ইস্যু আলোচনার জন্য উন্মুক্ত। এই ক্ষেত্রে ইরান ছাড় দিতে প্রস্তুত। তবে যুক্তরাষ্ট্রের যদি মূল উদ্বেগ হয় ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা, তাহলে তার সমাধানের কাঠামো আগেই তৈরি হয়েছে।”
তবে ইরানের অবস্থান শুধু ছাড় দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তেহরান এবার স্পষ্ট করে দিয়েছে, যেকোনো নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে দৃশ্যমান পদক্ষেপ থাকতে হবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিগুলোর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে ইরান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দেখছে।
ইরানের দাবি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ছাড়া কোনো চুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। একই সঙ্গে বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের সম্পদও মুক্ত করতে হবে বলে জানানো হয়েছে। তেহরানের মতে, এগুলো কোনো গৌণ বা আনুষঙ্গিক বিষয় নয়, বরং যেকোনো আলোচনার মূল ভিত্তি।
ফোয়াদ ইজাদি আরও বলেন, “ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে এবং বিদেশে জব্দ থাকা সম্পদ মুক্ত করতে হবে। এগুলোই তেহরানের প্রধান শর্ত।”
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই অবস্থান ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি বা জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (JCPOA)-এর অভিজ্ঞতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সেই চুক্তিতে অংশ নিয়েও পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত পরিবর্তন এবং নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল ইরানের আস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান তাই আগের মতো একতরফা ছাড় দিতে রাজি নয়। বরং তারা এমন একটি চুক্তি চায়, যেখানে অর্থনৈতিক স্বস্তি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সম্পদ পুনরুদ্ধার নিশ্চিত থাকবে।
এদিকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ইরান ও পশ্চিমাদের মধ্যে নতুন কোনো পারমাণবিক সমঝোতা হলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে দুই পক্ষের অবস্থানের দূরত্ব এখনো উল্লেখযোগ্য, যা আলোচনাকে জটিল করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরান আলোচনায় বসতে প্রস্তুত হলেও তাদের অবস্থান স্পষ্ট—পারমাণবিক ছাড়ের বিনিময়ে চাই বাস্তব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অর্থনৈতিক স্বস্তি। এ শর্ত পূরণ না হলে নতুন কোনো চুক্তির পথে অগ্রগতি কঠিন হতে পারে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।
কসমিক ডেস্ক