চাকরিতে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের বিধান বাতিলের সিদ্ধান্ত নিলেও বাস্তবায়ন করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও প্রশাসনকে দলমুক্ত করা নিয়ে সরকার ক্রমেই চাপে পড়ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রশাসনের ভেতরে রাজনৈতিক তৎপরতা আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেবে। এই বাস্তবতায় প্রশাসনের একটি অংশ এখন থেকেই সম্ভাব্য ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। ফলে প্রশাসনিক কাজের গতি কমেছে এবং দাপ্তরিক সিদ্ধান্তে পক্ষপাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দলীয় আশ্রয় খোঁজার প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের রাজনৈতিক যোগাযোগে জড়ানো আইন ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আইয়ুবুর রহমান খান মনে করেন, প্রশাসনের দলীয়করণ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং আমলাতন্ত্রের মূল কাঠামো ভেঙে দেয়। তাঁর মতে, প্রশাসনের কর্মকর্তারা যদি রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট হন, তাহলে জবাবদিহি দুর্বল হয় এবং দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়ে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক যোগাযোগকে অনেক কর্মকর্তা ‘বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখছেন। এতে প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতি ও পদায়নের নজির প্রশাসনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে বলেও তারা মনে করেন।
দীর্ঘদিন ধরে চাকরিতে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে পুলিশ ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে। এতে বহু যোগ্য প্রার্থী ও কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছেন। এ প্রেক্ষাপটে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের এই প্রথা বাতিলের সুপারিশ করেছিল। কমিশনের মতে, এখান থেকেই প্রশাসনের রাজনীতিকরণ শুরু হয়।
কমিশন আরও সুপারিশ করে, নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগে পুলিশ ভেরিফিকেশন না করা, বিসিএস উত্তীর্ণদের ক্ষেত্রে শুধু ফৌজদারি মামলার তথ্য যাচাই করা এবং নির্দিষ্ট শর্তে বেতন স্কেল সুবিধা দেওয়ার। তবে এসব সুপারিশ এখনো কার্যকর না হওয়ায় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার নিরপেক্ষ প্রশাসন গঠনে আন্তরিক হলেও রাজনৈতিক চাপ ও আমলাতান্ত্রিক বাস্তবতার কারণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না। ফলে নিরপেক্ষতার আড়ালে প্রশাসনের একটি অংশ এখনো দলীয় স্বার্থ বাস্তবায়নে সক্রিয় রয়েছে—যা গণতান্ত্রিক নির্বাচন ও সুশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
কসমিক ডেস্ক