দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত একটি নাম বালেন শাহ। সংগীতের মঞ্চ থেকে উঠে এসে রাজনীতির শীর্ষে পৌঁছানোর বিরল উদাহরণ তৈরি করতে যাচ্ছেন তিনি। বালেন শাহ, যার আসল নাম বালেন্দ্র শাহ, বর্তমানে নেপালের তরুণ প্রজন্মের কাছে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
তার জীবনকাহিনি কেবল একজন জনপ্রিয় শিল্পীর গল্প নয়; এটি এক তরুণের সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন, প্রতিবাদ এবং নেতৃত্বের গল্প।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
বালেন শাহ জন্মগ্রহণ করেন নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে। ছোটবেলা থেকেই তিনি সংগীত, সাহিত্য এবং সামাজিক বিষয় নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। পাশাপাশি পড়াশোনায়ও ছিলেন মনোযোগী।
তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরে নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনা বিষয়েও কাজ করেন। এই শিক্ষাগত পটভূমি পরবর্তীতে তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সংগীত জগতে তিনি ‘বালেন’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন।
র্যাপ সংগীতে জনপ্রিয়তা
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তিনি র্যাপ গান লেখা এবং পরিবেশন শুরু করেন। তার গানে উঠে আসে সমাজের অসঙ্গতি, দুর্নীতি, তরুণদের হতাশা এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।
নেপালের তরুণদের মধ্যে তার র্যাপ গান দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ তার গানে কেবল বিনোদন নয়, বরং ছিল প্রতিবাদ ও সচেতনতার বার্তা।
তার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে—
-
‘নেপালি হো’
-
‘বলিদান’
-
‘মেরো দেশ’
‘নেপালি হো’ গানটিতে তিনি জাতীয় পরিচয়, আত্মমর্যাদা এবং তরুণদের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। গানটি প্রকাশের পর নেপালের তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
‘বলিদান’ গানটিতে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সমালোচনা করা হয়েছে। অন্যদিকে ‘মেরো দেশ’ গানের মাধ্যমে তিনি দেশপ্রেম ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরেন।
এসব গানের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে শুধু একজন শিল্পী নন, বরং সামাজিক সচেতনতার কণ্ঠস্বর হিসেবেও পরিচিতি পান।
সংগীত থেকে রাজনীতিতে
সংগীতের মাধ্যমে সামাজিক সমস্যার কথা বললেও একসময় তিনি উপলব্ধি করেন যে কেবল গান দিয়ে সমাজে বড় পরিবর্তন আনা কঠিন।
এই উপলব্ধি থেকেই তিনি সরাসরি রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
২০২২ সালে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচনে অংশ নেন। অনেকের কাছে এটি ছিল সাহসী এবং প্রায় অসম্ভব এক সিদ্ধান্ত।
কিন্তু তরুণ ভোটারদের সমর্থন এবং তার পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি তাকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে।
শেষ পর্যন্ত তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হন। এতে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ রাজনীতিকদের মধ্যে একটি নতুন উদাহরণ তৈরি হয়।
জনপ্রিয়তার কারণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বালেন শাহর জনপ্রিয়তার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
প্রথমত, তিনি প্রচলিত রাজনৈতিক দলের বাইরে থেকে উঠে এসেছেন। ফলে তরুণদের কাছে তিনি একটি নতুন বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, তিনি তরুণদের ভাষায় কথা বলেন এবং তাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরেন।
তৃতীয়ত, সংগীতের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক অসঙ্গতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন।
এছাড়া নগর উন্নয়ন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ায় অনেক তরুণ তাকে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখেন।
জাতীয় রাজনীতিতে উত্থান
৫ মার্চ অনুষ্ঠিত নেপালের জাতীয় নির্বাচনের পর ভোট গণনা এখনো চলমান রয়েছে।
তবে নির্বাচনের শুরুতেই বালেন শাহ ভালো ব্যবধানে এগিয়ে আছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউএমএল)-এর সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি এবং নেপালি কংগ্রেসের গগন থাপার সঙ্গে।
বিবিসি নেপালের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (৭ মার্চ) সকাল পর্যন্ত যত ভোট গণনা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে বালেন শাহর মধ্যপন্থী রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) ১৬৫টি সরাসরি নির্বাচিত আসনের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি জায়গায় এগিয়ে রয়েছে।
নতুন প্রজন্মের রাজনীতির প্রতীক
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বালেন শাহর উত্থান দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি নতুন প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এটি দেখায় যে তরুণ প্রজন্ম এখন প্রচলিত রাজনীতির বাইরে নতুন নেতৃত্ব খুঁজছে।
র্যাপ সংগীতের মঞ্চ থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে পৌঁছানোর এই যাত্রা বালেন শাহকে ইতোমধ্যেই একটি অনন্য উদাহরণে পরিণত করেছে।
কসমিক ডেস্ক