উজানে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের প্রভাবে উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা তিস্তা নদী শুষ্ক মৌসুমে প্রায় মরা খালে পরিণত হয়েছে। ফলে দেশের বৃহত্তম তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। পর্যাপ্ত পানি না থাকায় সেচের লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও পূরণ করতে পারছে না বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
পাউবো সূত্র জানায়, বর্ষায় তিস্তায় গড়ে প্রায় দুই লাখ কিউসেক পানি প্রবাহ থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে তা নেমে আসে গড়ে দুই হাজার কিউসেকে। কখনো কখনো প্রবাহ ৫০০ কিউসেকেও নেমে যায়। এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার লাখো কৃষক।
তিস্তা ব্যারাজ থেকে শুরু হয়ে প্রকল্পের ৭৬৬ কিলোমিটার খাল ১২ উপজেলায় বিস্তৃত। ২০২১ সালে শুরু হওয়া ‘তিস্তা সেচ প্রকল্পের কমান্ড এলাকার পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের আওতায় এক হাজার ৪৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে খাল সম্প্রসারণের কাজ চলছে। পাউবোর দাবি, কাজের প্রায় ৯৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, অনেক ক্যানেল নির্মাণ শেষ হলেও সেখানে আজ পর্যন্ত তিস্তার পানি পৌঁছায়নি। ফলে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কৃষক বিকল্প সেচ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
নীলফামারীর কৃষক জাকারিয়া সরকার জানান, আগে ক্যানেলের পানি ব্যবহার করে বিঘা প্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা খরচ হতো। এখন বৈদ্যুতিক পাম্প ব্যবহার করতে গিয়ে বিঘা প্রতি ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা বেশি ব্যয় হচ্ছে।
আরেক কৃষক নুরুজ্জামান ইসলাম বলেন, ক্যানেল সংস্কার হলেও পানির দেখা মিলছে না। ফলে সার, বীজ ও সেচ ব্যয়ের বাড়তি চাপ তাদের ওপর পড়ছে। কৃষক আলাউদ্দিনের ভাষ্য, “ক্যানেল থাকা সত্ত্বেও সেচ পাম্প দিয়ে পানি দিতে হচ্ছে—তাহলে ক্যানেল ঠিক করে লাভ কী?”
এদিকে মাঠের বাস্তবতা ও দাপ্তরিক বক্তব্যে দেখা দিয়েছে বিভ্রান্তি। নীলফামারী পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান দাবি করেন, জেলায় সেচের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ১০ হাজার কিউসেক পানির প্রয়োজন এবং তা পর্যাপ্ত রয়েছে। তবে ডালিয়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, ব্যারাজের উজানে ৭০০ থেকে ২৫০০ কিউসেক পানি পাওয়া গেলেও ভাটির প্রায় ১১০ কিলোমিটার এলাকায় ১০০ কিউসেক পানিও নেই।
নথি অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে সেচের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৪ হাজার ৩৭৮ হেক্টর। তিন দশক পর চলতি মৌসুমে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭ হাজার হেক্টর। তবে বর্তমান পানিপ্রবাহ অব্যাহত থাকলে এর অর্ধেকও অর্জন কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেড় হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো গড়ে উঠলেও মূল নদীতে পানি নিশ্চিত না হওয়ায় তিস্তা সেচ প্রকল্পের কার্যকারিতা এখন প্রশ্নের মুখে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উত্তরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের জীবিকায়।
কসমিক ডেস্ক