বরিশালে আদালতের এজলাসে হট্টগোল ও ভাঙচুরের ঘটনার জেরে টানা তিন দিন ধরে বিচারিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের আদালত বর্জন কর্মসূচির মধ্যে জেলা আইনজীবী সমিতির এক নেতাকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ফলে হাজারো বিচারপ্রার্থী চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাদের জামিন দেওয়া নিয়ে। গত সোমবার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস আদালতে আত্মসমর্পণের পর জামিন পান। অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শরীয়তউল্লাহ তাঁর জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। এর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশাল-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ-সহ আরও কয়েকজন নেতা জামিনে মুক্তি পান।
এই ঘটনার প্রতিবাদে বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা চিফ মেট্রোপলিটন আদালত ও অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের কার্যক্রম বর্জন করেন। তাঁরা আদালত প্রাঙ্গণে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভও করেন। পরদিন মঙ্গলবার বিকেলে বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন আদালতের এজলাসে ঢুকে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান (লিংকন)সহ কয়েকজন আইনজীবী হট্টগোল করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাঁরা বেঞ্চে ধাক্কাধাক্কি, কাগজপত্র তছনছ এবং ভাঙচুর করেন। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
পরদিন দ্রুত বিচার আইনে করা মামলায় সাদিকুর রহমানকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করার পর তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। এ ঘটনায় আরও ১২ আইনজীবীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলা জজ আদালত প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, বিচারপ্রার্থীরা ফাইল হাতে এজলাসের সামনে ঘুরছেন। সবুজ হাওলাদার নামের এক বিচারপ্রার্থী জানান, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি মামলায় তাঁদের জামিনের মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নিম্ন আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করার কথা। কিন্তু টানা তিন দিন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তিনি আবেদন করতে পারছেন না। সামনে সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তিনি।
শুধু তিনিই নন, বাকেরগঞ্জ থেকে আসা আনসার আলী হাওলাদারসহ অনেকেই হাজিরা ও শুনানির জন্য এসে ফিরে যাচ্ছেন। সকাল থেকে অপেক্ষা করেও কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
আইনজীবীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দাবি-দাওয়া পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি প্রত্যাহার সম্ভব নয়। তবে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগের বিষয়টি তাঁরা স্বীকার করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আদালত প্রাঙ্গণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের কার্যক্রম দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বিচারপ্রার্থীদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয় এবং মামলার জট আরও বাড়ে। বিশেষ করে জামিন, হাজিরা ও জরুরি শুনানির ক্ষেত্রে বিলম্ব বড় ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
সার্বিকভাবে, বরিশালে আদালতকেন্দ্রিক এই অচলাবস্থা বিচারব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলেছে। আইনজীবীদের বর্জন, গ্রেপ্তার ও প্রতিবাদ কর্মসূচির মধ্যে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন বিচারপ্রার্থীরা।
কসমিক ডেস্ক