রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনার তালিকায় আরও একটি প্রাণহানির ঘটনা যুক্ত হলো। ঢাকার লালবাগ এলাকার আজিমপুরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনায় আমজাদ হোসেন (৬০) নামে এক রিকশাচালকের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) ভোরে আজিমপুর এতিমখানার বিপরীত পাশের সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে নিহতের স্বজনরা জানিয়েছেন।
নিহত আমজাদ হোসেন ঢাকার দোহার থানার জৈনকি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তার বাবার নাম শেখ ধলা মিয়া। জীবিকার তাগিদে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন এবং রাজধানীর ফার্মগেট তেজকুনিপাড়া এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। দুই ছেলের জনক আমজাদ হোসেন প্রতিদিনের মতো ব্যাটারিচালিত রিকশা চালিয়েই সংসারের খরচ জোগাতেন।
নিহতের ছেলে সাকিব হোসেন জানান, বৃহস্পতিবার রাতের দিকে তার বাবা ফার্মগেটের বাসা থেকে রিকশা নিয়ে বের হন। প্রতিদিনের রুটিন অনুযায়ী তিনি রাতভর রিকশা চালিয়ে ভোরে বাড়ি ফিরতেন। কিন্তু শুক্রবার ভোরে আজিমপুর এলাকায় দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। সাকিবের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোরের দিকে আজিমপুর সড়কে রিকশাটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি গতিরোধকের সঙ্গে ধাক্কা খায়। এতে রিকশাটি উল্টে গিয়ে রাস্তার ওপর পড়ে যায়।
ঠিক সেই সময় দ্রুতগতির একটি ট্রাক ওই পথ দিয়ে আসছিল। রাস্তায় পড়ে থাকা রিকশা ও চালককে ট্রাকটি চাপা দিলে আমজাদ হোসেন গুরুতর আহত হন। ঘটনাস্থলে থাকা লোকজন এবং পুলিশের সহযোগিতায় তাকে দ্রুত উদ্ধার করা হয়। পরে সকাল পৌনে ৭টার দিকে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-এর জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
দুর্ঘটনার খবরে পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটি আর বেঁচে নেই। স্বজনদের কান্নায় হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। নিহতের পরিবার জানায়, আমজাদ হোসেন ছিলেন শান্ত স্বভাবের মানুষ এবং পরিবারের জন্য নিরলস পরিশ্রম করতেন। তার হঠাৎ মৃত্যুতে পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
ঢামেক পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক জানান, নিহতের মরদেহ হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানাকে অবহিত করা হয়েছে এবং আইনানুগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। দুর্ঘটনায় জড়িত ট্রাকটি শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও তদন্ত শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান।
স্থানীয়রা বলছেন, আজিমপুর ও আশপাশের এলাকায় ভোরের দিকে ভারী যান চলাচল তুলনামূলক বেশি থাকে। একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অন্যান্য ছোট যানবাহন চলাচল করায় ঝুঁকি বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় এমন দুর্ঘটনা ঘটে বলে তাদের অভিযোগ।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এসব রিকশার গতি নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট লেন ব্যবস্থা এবং ভারী যানবাহনের সঙ্গে একই সড়কে চলাচলের ঝুঁকি—সব মিলিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে। নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই সমস্যা কমানো কঠিন বলে তারা মত দিয়েছেন।
আমজাদ হোসেনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে—রাজধানীর সড়কে শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত। প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে বের হওয়া মানুষেরা যে কোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন—এই বাস্তবতা নতুন করে সামনে এসেছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে দ্রুত আইনি সহায়তা ও দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করা হয়েছে। তারা বলছেন, এই মৃত্যু যেন শুধু একটি সংখ্যায় সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।